অস্ট্রিয়ায় ডানিউবের তলদেশ থেকে মিলল ২ হাজার বছরের পুরোনো লোহার ভান্ডার, ৫০০ তলোয়ারের সমান লোহা

অস্ট্রিয়ায় ডানিউব নদীর পুরোনো একটি পলিভরা খালে মিলেছে লৌহযুগের বিপুল লোহার বারের ভান্ডার। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ভাষ্যে, এটি ইউরোপে জানা সবচেয়ে বড় লৌহযুগের লোহার বারের সংগ্রহ। অন্তত ৫০০টি লোহার বার উদ্ধার হয়েছে, যার মোট ওজন এক মেট্রিক টনের বেশি। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এই লোহা দিয়ে প্রায় ৫০০টি তলোয়ার তৈরি করা যেত।
ভান্ডারটি প্রথম পাওয়া গিয়েছিল ২০১৯ সালে। অস্ট্রিয়ার ডাইনহাম এলাকায় নুড়ি তোলার কাজের সময় শ্রমিকেরা ডানিউবের পুরোনো, পলিতে ভরে যাওয়া একটি খালে লোহার বারগুলো দেখতে পান। গবেষকেরা এই সংগ্রহকে ‘মরিচা ধরা গুপ্তধন’ বলে বর্ণনা করেছেন। লৌহযুগে লোহার উৎপাদন ও বাণিজ্য যখন ইউরোপজুড়ে বাড়ছিল, তখন এমন পণ্য ছিল অত্যন্ত মূল্যবান।
অস্ট্রিয়ার ইনসব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার ট্রেবশে বলেছেন, নুড়ি তোলার শ্রমিকেরা সৌভাগ্যক্রমে এই আবিষ্কারের কথা স্মৃতিস্তম্ভ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন; তাঁরা বারগুলো কোনো ভাঙারি ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করেননি। খুঁজে পাওয়া ব্যক্তিরা এই অসাধারণ ভান্ডার একটি রাষ্ট্রীয় জাদুঘরের সংগ্রহে দান করেছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন। ট্রেবশের ভাষায়, এই আবিষ্কার ‘ছোটখাটো এক অলৌকিক ঘটনার’ চেয়ে কম নয়।
রেডিওকার্বন পরীক্ষা অনুযায়ী, লোহার বারগুলো সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় বা দ্বিতীয় শতকের—অর্থাৎ দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। প্রতিটি তলোয়ারের ওজন সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার পাউন্ডের মধ্যে ধরে হিসাব করলে এই লোহা দিয়ে প্রায় ৫০০টি তলোয়ার বানানো সম্ভব হতো বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। তবে ট্রেবশে বলেছেন, ৫০০ তলোয়ারের সংখ্যাটি একটি হিসাব মাত্র; এই লোহা দিয়ে হাতিয়ারের বদলে সরঞ্জাম বা অলংকারও তৈরি হতে পারত।
ভান্ডারটি কোথায় নেওয়া হচ্ছিল, তা জানা যায়নি। গবেষকদের ধারণা, লোহা সম্ভবত জার্মানির বাভারিয়ায় তৈরি হয়েছিল এবং ডানিউব নদীপথে পরিবহন করা হচ্ছিল। নদীতে বারগুলো যেভাবে পাওয়া গেছে, তাতে জাহাজডুবিই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা বলে মনে করছেন ট্রেবশে। তবে কোনো জাহাজের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি।
ট্রেবশে জানিয়েছেন, ডানিউবের ওই অংশে পাথরের গোলা ও বালুচরের মতো নৌচলাচলের ঝুঁকি রয়েছে, তাই জাহাজের কোনো অংশ উদ্ধার হয়নি। তাঁর আরেকটি যুক্তি হলো, পাওয়া জিনিসগুলোর কোনোটিতেই ইচ্ছাকৃত ধ্বংসের চিহ্ন নেই; থাকলে সেগুলোকে পরবর্তী লৌহযুগের কোনো আচার-অনুষ্ঠানের নৈবেদ্য বলা যেত।
ট্রেবশের মতে, এই আবিষ্কারের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো একসঙ্গে পরিবহন করা লোহার পরিমাণ। ডাইনহাম থেকে পাওয়া লোহার পরিমাণ ওই সময়ের সবচেয়ে বড় লোহার ভান্ডারের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি। একটি মাত্র বাণিজ্যিক লেনদেনের জন্য পরবর্তী লৌহযুগে এত লোহা পাওয়া যেত, সেটিই তাঁকে সবচেয়ে অবাক করেছে।
গবেষণাটি প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক সাময়িকী ‘অ্যান্টিকুইটি’তে এই শরতের শুরুতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষক দলে ট্রেবশের সঙ্গে ছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিক মারিয়ন বেরানজার। গবেষকদের ভাষ্যে, লোহার জিনিসপত্র প্রায়ই উপেক্ষিত হয় বা সেগুলোর বয়স নির্ধারণ কঠিন হওয়ায় প্রাচীন লোহার উৎপাদনের মাত্রা মাপা কঠিন ছিল; ডানিউবের তীরে নুড়ি তোলার সময় পাওয়া দুই মাথাওয়ালা বহু লোহার বস্তু সেই বড় আকারের উৎপাদন ও বাণিজ্য খতিয়ে দেখার বিরল সুযোগ করে দিয়েছে।
ট্রেবশে বলেছেন, এই আবিষ্কার দেখিয়ে দিচ্ছে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় ও দ্বিতীয় শতকে ডানিউব অঞ্চলে লোহার উৎপাদনের সক্ষমতা কতটা বেড়েছিল।



