চীনা আমদানির চাপে ইউরোপের কফিনশিল্প: পাঁচ বছরে বন্ধ প্রায় এক-চতুর্থাংশ কারখানা, ব্রাসেলসে তদন্তের আবেদন

ইউরোপের কফিন নির্মাতারা একজোট হয়ে ব্রাসেলসের কাছে চীনা আমদানির তদন্ত চাইছেন। তাঁদের সতর্কবার্তা—কম দাম ও সম্ভাব্য শুল্ক ফাঁকি মহাদেশের অন্যতম নিশ্চিত চাহিদার বাজার, অর্থাৎ মৃত্যুকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই শিল্পকেই হুমকিতে ফেলছে।
এত দিন কোনো নিবেদিত লবি প্রতিনিধিত্ব না থাকা নির্মাতাদের একটি দল একটি জোট গঠন করেছে এবং বাণিজ্য বিভাগসহ ইউরোপীয় কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বলে উদ্যোগটির আয়োজকেরা জানিয়েছেন। জোটটি একটি অ্যান্টি-ডাম্পিং অভিযোগ প্রস্তুত করছে—অর্থাৎ চীনা কফিন নির্মাতারা ইউরোপে অন্যায্যভাবে কম দামে পণ্য বিক্রি করছে কি না, তা তদন্তের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ক্ষতি ইতিমধ্যে চোখে পড়ছে। অভিযোগটির সমন্বয়ে সহায়তাকারী পরামর্শক ফলকো চিউল্লির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ইউরোপের প্রায় এক-চতুর্থাংশ কফিন নির্মাতা বন্ধ হয়ে গেছে—তাদের সংখ্যা প্রায় ১২০ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৯০-এ।
চিউল্লি বলেন, ছোট কোম্পানিগুলো ইউরোপের বাইরের আমদানিকারকদের প্রতিযোগিতা সহ্য করতে পারেনি। যারা টিকে আছে, তারা বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর আগের উৎপাদনের মাত্র অর্ধেক নিজেরা সামলাতে পেরেছে।
এই উদ্যোগের আগে গত বছর ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একদল সদস্য বাণিজ্য কমিশনার মারোশ শেফচোভিচের কাছে চীনা প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আবেদন করেছিলেন। তাঁদের বলা হয়েছিল, শিল্পটি আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য অভিযোগ দাখিল করতে পারে।
কমিশনের এক মুখপাত্র বলেছেন, অন্যায্যভাবে বাণিজ্য করা আমদানির বিরুদ্ধে ইইউ কঠোর ব্যবস্থা নেয় এবং বর্তমানে এ ধরনের ২০০-র বেশি ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। তবে নির্মাতাদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করতে তিনি রাজি হননি; তাঁর ভাষ্য, সম্ভাব্য বাণিজ্য-প্রতিরক্ষা অভিযোগ নিয়ে শিল্পমহলের সঙ্গে যোগাযোগ গোপনীয়।
শিল্পটির যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে দামের বড় ব্যবধান। নির্মাতাদের হিসাব অনুযায়ী, একই ধরনের কাঠ ব্যবহার করলেও চীনে একটি কফিন তৈরি করতে খরচ পড়ে ইতালির সমমানের পণ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
এখনো নাম ঠিক না হওয়া জোটটি চীনা উৎপাদকদের সুবিধার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছে—রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, রপ্তানি-সংক্রান্ত কর সুবিধা, কম শ্রমখরচ ও সস্তা কাঠ। তাদের আরও যুক্তি, চীনা নির্মাতারা কাঁচামাল সরবরাহে অগ্রাধিকারমূলক শৃঙ্খলের সুবিধা পায়, আর চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক উৎপাদনকে ইউরোপের দিকে ঘুরিয়ে দিতে সাহায্য করেছে।
তবে ইইউর বাণিজ্য নিয়ম অনুযায়ী শুধু কম দামই ডাম্পিং প্রমাণ করে না। অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক পেতে ইউরোপীয় নির্মাতাদের প্রমাণ করতে হবে, চীনা উৎপাদকেরা প্রতিষ্ঠিত স্বাভাবিক মূল্যের নিচে ইইউতে কফিন বিক্রি করছে, ইইউর শিল্প বস্তুগত ক্ষতির শিকার হচ্ছে এবং সেই ক্ষতির জন্য ডাম্প করা আমদানিই দায়ী। এ কারণে জোটটি চীন ও ইউরোপে তৈরি সমমানের কফিনের উৎপাদন খরচ, কাঁচামাল, শ্রম ও কারখানা-দর তুলনা করার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে।
নির্মাতারা আরেকটি ধারণাও খতিয়ে দেখছেন—চীন থেকে ইইউতে ঢোকা কিছু কফিন শুল্ক কর্তৃপক্ষের কাছে কফিন হিসেবেই শ্রেণিবদ্ধ হচ্ছে না। শিল্পটির বাণিজ্য ও উৎপাদন তথ্য বিশ্লেষণে নিয়োজিত গণিতবিদ এমিলিয়ানো ইনগুশিওর হিসাব অনুযায়ী, শুধু ইতালিতেই বছরে প্রায় ৩০ হাজার কফিনের সমপরিমাণ ব্যাখ্যাহীন ব্যবধান রয়েছে। তাঁর যুক্তি, কফিনের চাহিদা তুলনামূলকভাবে অনুমানযোগ্য এবং মৃত্যুহারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে বড় ব্যবধান ইঙ্গিত দিতে পারে যে কিছু আমদানি ঠিকমতো নথিভুক্ত হচ্ছে না।
জোটটির উদ্বেগের জায়গা হলো ‘আইকিয়া ফাঁকি’ নামে পরিচিত একটি ধারণা—কিছু চীনা কফিন সমতল-প্যাক (ফ্ল্যাট-প্যাক) আকারে ইউরোপে আসে এবং সেগুলোর অংশগুলো শুল্কে তৈরি আসবাব নয়, কাঠের অংশ হিসেবে ঘোষণা করা হয়; ইইউতে ঢোকার পর অংশগুলো জোড়া দিয়ে কফিন হিসেবে বিক্রি করা হয়। কমিশন অবশ্য নিশ্চিত করেছে, আন্তর্জাতিক শুল্ক নিয়ম অনুযায়ী অসংযুক্ত পণ্যও তৈরি পণ্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হতে পারে, যদি তা সম্পূর্ণ পণ্যের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য ধরে রাখে। শিল্পটি আরেকটি সম্ভাব্য ফাঁকির কথাও তুলেছে—অন্য পণ্যের প্যাকেজিং হিসেবে কফিন আমদানি।
কফিন নির্মাতাদের এই তৎপরতা চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্য বিরোধের বৃহত্তর বদলেরই অংশ—কম দামের প্রতিযোগিতা নিয়ে অভিযোগ বৈদ্যুতিক গাড়ি, ইস্পাত ও রাসায়নিকের মতো কৌশলগত খাত ছাড়িয়ে ঐতিহ্যবাহী পণ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। কমিশনের সর্বশেষ বার্ষিক বাণিজ্য-প্রতিরক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইইউ ৩২টি নতুন বাণিজ্য-প্রতিরক্ষা তদন্ত শুরু করেছে।
ছোট ঐতিহ্যবাহী শিল্প হিসেবে সুরক্ষা পাওয়ার নজিরও রয়েছে। জানুয়ারিতে চীনা মোমবাতির ওপর ৫৬ থেকে ৬০ শতাংশ অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসিয়েছিল কমিশন—তদন্তে দেখা গিয়েছিল, প্রায় ৮০টি কোম্পানিতে ৯ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সেই ইইউ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।



