স্পেনের দ্রুতগতির রেলে একের পর এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা: রক্ষণাবেক্ষণে খরচ মাত্র ১৬ শতাংশ, প্রশ্নের মুখে পুরো ব্যবস্থা
স্পেনের দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে ছিল দেশটির জাতীয় গর্বের প্রতীক—আধুনিকায়ন ও ইউরোপের শীর্ষ অর্থনীতির সারিতে ওঠার চিহ্ন। কিন্তু বুধবারের প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনা, যার মাত্র কয়েক মাস আগে জানুয়ারিতে ঘটেছিল আরেকটি বড় প্রাণহানির রেল দুর্ঘটনা, সেই গর্বকে এখন রাজনৈতিক দায়ে পরিণত করছে।
বুধবার তোলেদোর কাছে দুই ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৯ জন নিহত হয়েছেন। বিরোধী নেতা আলবের্তো নুনিয়েস ফেইহো বৃহস্পতিবার বলেছেন, আট মাসের ব্যবধানে দুটি ট্রেন দুর্ঘটনায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু রেল ব্যবস্থার অখণ্ডতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে, এবং স্পেনের মানুষ এর জবাব পাওয়ার অধিকার রাখে।
স্পেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় বলছে, প্রাথমিক তদন্তে ব্যর্থতার একটি ধারাবাহিক চিত্র মিলেছে। ১৯৯২ সালে বসানো জার্মান-তৈরি সিগন্যালিং ব্যবস্থা কম্পিউটার ত্রুটিতে অকেজো হয়ে পড়ার পর রেল নেটওয়ার্কের কর্মকর্তারা নিজেরা নিয়ন্ত্রণ নেন এবং একটি ট্রেনকে এমন লাইনে এগোনোর অনুমতি দেন, যেখানে আরেকটি ট্রেন থেমে ছিল—তাতেই ঘটে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ।
ইউরোপীয় রেল-সিগন্যালিং সার্টিফিকেশন গবেষণাগারের সাবেক পরিচালক হাইমে তামারিত বলেন, ট্রেন-সুরক্ষা ব্যবস্থার মূল কাজই মানুষের ভুল থেকে রক্ষা করা; এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতা ইঙ্গিত দেয় অবকাঠামোর অবস্থা ভয়াবহ। তাঁর ভাষ্য, লাইন বাড়লে কর্মীও বাড়াতে হয় এবং রক্ষণাবেক্ষণে খরচও বাড়াতে হয়, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ রাজনৈতিকভাবে অদৃশ্য বলেই তাতে বিনিয়োগ পিছিয়ে থাকে।
অর্থনৈতিক সংকট ও পরবর্তী কৃচ্ছ্রসাধনের বছরগুলোতে স্পেনের রেলে বিনিয়োগ তীব্রভাবে কমে গিয়েছিল। পরে খরচ বাড়লেও প্রকৃত মূল্যে তা সংকট-পূর্ব মাত্রার অনেক নিচেই রয়ে গেছে।
ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত স্পেন দ্রুতগতির রেলে বছরে গড়ে ১৫০ কোটি ইউরো বরাদ্দ করেছে—ফ্রান্স বা জার্মানির চেয়েও বেশি—কিন্তু সেই অর্থের বড় অংশ গেছে নতুন অবকাঠামো নির্মাণে। রক্ষণাবেক্ষণ, নবায়ন ও আধুনিকায়নে গেছে মাত্র প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালিতে এই হার ৩৪ থেকে ৩৯ শতাংশ।
স্পেনের রেল অবকাঠামো ব্যবস্থাপক আদিফ বারবার নিজেদের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত বলে দাবি করেছে এবং বলেছে, তারা সবসময় নিরাপত্তার শর্ত মেনে চলেছে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে প্রতিষ্ঠানটি তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়নি।
গালিসিয়ার জাতীয়তাবাদী বিএনজি দলের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য আনা মিরান্দা অভিযোগ করেছেন, স্পেনের কর্তৃপক্ষ অতীতের রেল বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেয়নি। তিনি বুধবারের তোলেদো দুর্ঘটনার সঙ্গে ২০১৩ সালের গালিসিয়ার আংরোইস দুর্ঘটনার তুলনা টেনেছেন, যাতে ৮০ জন নিহত ও ১৫২ জন আহত হয়েছিলেন।
ইউরোপীয় রেল সংস্থা ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলেছিল, আংরোইস দুর্ঘটনার তদন্ত প্রয়োজনীয় স্বাধীনতার মান পূরণ করেনি এবং নতুন তদন্তের সুপারিশ করেছিল। এরপর ইউরোপীয় কমিশন স্পেনের রেল নিরাপত্তা তদারকির বৃহত্তর ঘাটতি নিয়ে লঙ্ঘন-প্রক্রিয়াও (ইনফ্রিঞ্জমেন্ট) শুরু করে।
মিরান্দা আরও বলেছেন, জানুয়ারির আদামুস দুর্ঘটনা নিয়েও কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট কঠোর তদন্ত করেনি; সেই দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন। তদন্তে সহায়তাকারী এক স্বাধীন কারিগরি তদন্তকারীর অভিযোগ, আদিফ দুর্ঘটনার প্রতিবেদন বদলে দিয়েছে—আদিফ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা বিচারিক তদন্তে সহযোগিতা করেছে।
বুধবারের সংঘর্ষে জড়িত ট্রেন দুটি ইআরটিএমএস ব্যবহার করছিল না—এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানসম্মত রেল-সিগন্যালিং ব্যবস্থা, যা অনুমোদিত গতি ছাড়িয়ে যাওয়া বা সিগন্যাল অমান্য করা ট্রেনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে থামাতে পারে। তদন্তকারীরা এখনো নিশ্চিত নন, এই ব্যবস্থা থাকলে দুর্ঘটনা এড়ানো যেত কি না।
ইউরোপজুড়ে সর্বশেষ রেল-সুরক্ষা প্রযুক্তি বসানোর কাজ নির্ধারিত সময়ের অনেক পেছনে রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন রেল সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ ইআরটিএমএসের মূল সিগন্যালিং উপাদান ইউরোপীয় ট্রেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু ছিল মাত্র প্রায় ১২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার লাইনে—ইইউর ট্রান্স-ইউরোপীয় পরিবহন নেটওয়ার্কের প্রায় ১০ শতাংশ। জাতীয় পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৪০ হাজার কিলোমিটারে নেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও ইইউর এক কর্মকর্তা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, সেই লক্ষ্যও পূরণ হবে কি না।
বুধবারের সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে ছিলেন স্পেনের বিতর্কিত ২০১২ সালের শ্রম সংস্কারের তদারককারী ফাতিমা বানিয়েসও। এই দুর্ঘটনা ২৯ নভেম্বরের আগাম নির্বাচনের প্রচারের কেন্দ্রে রেল ব্যবস্থাকে টেনে এনেছে এবং প্রধানমন্ত্রীর সেই বার্তাকেই চাপে ফেলেছে যে তাঁর সরকার যোগ্য এবং স্পেনের মানুষের দৈনন্দিন জীবন উন্নত করছে।



