যুক্তরাজ্যে ২ হাজার ৪০০ কোটি পাউন্ডের কার্বন ক্যাপচার পরিকল্পনা কাটছাঁটের আহ্বান প্রচারকদের, ‘প্রযুক্তি রূপকথা’ বললেন প্যাকহাম

যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রীর প্রতি কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তিতে সরকারের ২ হাজার ৪০০ কোটি পাউন্ড ব্যয়ের পরিকল্পনা কাটছাঁট করার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ প্রচারকেরা। তাঁদের বক্তব্য, এই অর্থ এমন সবুজ প্রকল্পে দেওয়া হোক, যেগুলো নির্ভরযোগ্যভাবে নির্গমন কমাতে ও পরিবারগুলোর জ্বালানি বিল কমাতে পারে।
পরিবেশবাদী ক্রিস প্যাকহাম এই আহ্বানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। চলতি সপ্তাহের বাজেটের আগে ট্রেজারির প্রতি শেষ মুহূর্তের আবেদনে তিনি কার্বন ক্যাপচারের প্রতি সরকারের সমর্থনকে ‘অতিমাত্রায় ব্যয়বহুল’ বলেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই সমর্থনের পরিমাণ এখন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নরওয়ে ও জাপানের পরিকল্পিত ব্যয়ের সম্মিলিত পরিমাণের চেয়েও বেশি।
প্যাকহাম বলেন, বিপি ও নরওয়ের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ইকুইনরসহ বড় তেল কোম্পানিগুলোর তৈরি কার্বন ক্যাপচার ও স্টোরেজ (সিসিএস) প্রকল্পগুলোর জন্য ২ হাজার ৪০০ কোটি পাউন্ড বরাদ্দ রাখা ‘জাতীয় লজ্জা’। তিনি মন্ত্রীদের ‘বিষয়টি ঠিক করার’ আহ্বান জানান।
প্যাকহাম বলেন, ‘সিসিএস একটি প্রযুক্তি রূপকথা।’ তাঁর মতে, যুক্তরাজ্য অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি করদাতার অর্থ এতে ঢালছে, যা জাতীয় লজ্জা হওয়া উচিত; এই বাজেট সেই ভুল শোধরানোর সুযোগ।
এই হস্তক্ষেপ এমন সময়ে এল, যখন খবরে বলা হচ্ছে সরকার গ্যাস বয়লার বদলে বৈদ্যুতিক হিট পাম্প নিতে ইচ্ছুক পরিবারগুলোর জন্য অনুদান কমানোর পরিকল্পনা করছে। ভবন গরম রাখা থেকে নির্গত কার্বন যুক্তরাজ্যের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, তাই এই বদল নির্গমন কমানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।
প্যাকহাম সরকারের প্রতি আহ্বান জানান, ‘অনিশ্চিত ফলের অতিমাত্রায় ব্যয়বহুল প্রকল্পে অর্থ ঢালার’ বদলে যেসব প্রতিশ্রুতি পরিবারগুলোকে বিল কমাতে সাহায্য করে, সেগুলোর অর্থায়ন রক্ষা করতে। পরিকল্পিত সিসিএস ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা হলে তা হবে আরেকটি জোরালো ইঙ্গিত যে সরকার বড় তেল কোম্পানিকে মানুষ ও গ্রহের ওপরে রাখছে, বলেন তিনি।
কার্বন ক্যাপচার প্রযুক্তি নকশা করা হয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানির অবকাঠামো থেকে নির্গমন বায়ুমণ্ডলে ছড়ানোর আগেই আটকে ফেলার জন্য। সমর্থকদের ধারণা, কার্বন ডাই-অক্সাইড পাইপে করে ভূগর্ভস্থ সংরক্ষণাগারে পাঠালে যেসব শিল্প জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে পরিচ্ছন্ন বিকল্প নিতে পারে না, তাদের জন্য স্থায়ী জলবায়ু সমাধান মিলতে পারে। অনেক দেশের নেতা এই প্রযুক্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তবে প্রচারকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রযুক্তিটি কোথাও কোথাও সফলভাবে কাজ করলেও অনেক উচ্চব্যয়ের প্রকল্প এগোতে হিমশিম খেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কার্বন সাশ্রয় প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম হয়েছে। সবুজ গোষ্ঠীগুলোর আশঙ্কা, জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো এই প্রযুক্তির প্রচার করছে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দীর্ঘায়িত করার জন্য।
অয়েল চেঞ্জ ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ গবেষক অ্যালেড ডিলউইন ফিশার বলেন, জলবায়ু খাতে ব্যয় কমিয়ে প্রতিরক্ষা খাতে দেওয়া উদ্বেগজনক; কিন্তু প্রমাণিত জলবায়ু সমাধানে কাটছাঁট করে অনির্ভরযোগ্য কার্বন ক্যাপচার প্রকল্পে অর্থ ঢালতে থাকা হবে অপমানের ওপর আঘাত। তাঁর মতে, এই বাজেটে সরকারি অর্থ সেখানে দেওয়া উচিত যেখানে তা জলবায়ুর জন্য সত্যিকারের পার্থক্য গড়তে ও মানুষের জ্বালানি বিল কমাতে পারে।
যুক্তরাজ্যের প্রথম সিসিএস প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু হয়েছে উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডের টিসাইড ও হাম্বারসাইডের কাছে ইস্ট কোস্ট ক্লাস্টারে এবং উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের মার্সিসাইড ও উত্তর ওয়েলসের কাছে হাইনেট ক্লাস্টারে। সরকারের সিসিএস সমর্থন পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে অ্যাবারডিনশায়ারের অ্যাকর্ন প্রকল্পের জন্য ২০ কোটি পাউন্ড রয়েছে, সঙ্গে স্কটিশ সরকারের ৮ কোটি পাউন্ড।
ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ স্কটল্যান্ডের প্রচারক রোজি হ্যাম্পটন গ্রীষ্মকালে বলেছিলেন, সরকারের জলবায়ু প্রতিক্রিয়া গড়ে উঠছে উত্তর সাগরকে ইউরোপের কার্বন ফেলার জায়গায় পরিণত করার ‘কল্পনা পরিকল্পনার’ ওপর, যদিও রাজনীতিবিদদের মনোযোগ দেওয়া উচিত উষ্ণ ঘর, ভালো গণপরিবহন ও ভালো সবুজ চাকরির মতো সমাধানে, যা মানুষের জীবন উন্নত করবে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও নেট জিরো বিভাগের সংসদীয় আন্ডার-সেক্রেটারি মার্টিন ম্যাকক্লাস্কি এই মাসে একটি শিল্প অনুষ্ঠানে বলেন, সরকার কার্বন ক্যাপচারের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে, তবে আর্থিক চাপের কারণে শিল্পটির বিকাশের গতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
কার্বন ক্যাপচার অ্যান্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন (সিসিএসএ) জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের প্রথম প্রকল্পগুলো ইতিমধ্যে ৪০০ কোটি পাউন্ডের বেশি সরবরাহ-শৃঙ্খল চুক্তি দিয়েছে, যা প্রায় ৩৫০টি যুক্তরাজ্যের কোম্পানি ও ৫ হাজার ৫০০ নির্মাণ চাকরিকে সমর্থন করতে পারে। সংগঠনটির যুক্তরাজ্য পরিচালক মার্ক সমারফেল্ড বলেন, এখন পিছিয়ে গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ণ হবে, অবকাঠামো অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং শিল্প পতন আরও গভীর হবে; এই বাজেটে বিদ্যমান প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।



