কানাডা ছাড়ার পথে ‘না’ আলবার্টার ভোটারদের: বিচ্ছিন্নতার প্রস্তাব নাকচ, জয় ঐক্যের
কানাডার তেলসমৃদ্ধ প্রদেশ আলবার্টার ভোটাররা স্বাধীনতার দিকে যাত্রা শুরুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। সোমবার অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, প্রায় ৭৬ শতাংশ ভোটার কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছেন, আর বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরু করার পক্ষে ভোট পড়েছে মাত্র ২৩ শতাংশ। মঙ্গলবার ভোরে ১০ লাখের বেশি ভোট গণনার পর এই চিত্র স্পষ্ট হয়। কানাডার জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিবিসিও একই ফলের পূর্বাভাস দিয়েছে।
এই জয়কে প্রধানমন্ত্রী মার্ক মার্ক কার্নি এবং কানাডার ঐক্যের সমর্থকদের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে— বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার হুমকি দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য, এই ভোট সরাসরি স্বাধীনতার প্রশ্নে ছিল না। ভোটাররা সিদ্ধান্ত দিচ্ছিলেন— আলবার্টা কানাডার সঙ্গে থাকবে, নাকি এমন একটি আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে দ্বিতীয় একটি ভোটের দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছেও বিষয়টি ছিল হতাশার, কারণ প্রশ্নটি সরাসরি স্বাধীনতা নিয়ে ছিল না।
‘ফরএভার কানাডিয়ান’ প্রচারণার নেতা ও আলবার্টার সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী থমাস লুকাশুক সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, “আমরা একটি শক্তিশালী দেশ, যা এক উপকূল থেকে আরেক উপকূল পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ।”
ভোটের ফল প্রকাশে দেরি হয়েছে। দেরিতে কেন্দ্র খোলার কারণে সোমবার ১০০টির বেশি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণের সময় বাড়াতে হয়, ফলে ফল পেতে দুই ঘণ্টার বেশি দেরি হয়। প্রদেশজুড়ে মোট ভোটকেন্দ্র ছিল প্রায় ১ হাজার ৪০০টি।
ভোটার উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। ইলেকশনস আলবার্টার তথ্য অনুযায়ী, ১৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি আলবার্টান— যোগ্য ভোটারের প্রায় ৪৩ শতাংশ— আগাম বা বিশেষ ব্যালটে আগেই ভোট দিয়ে রেখেছিলেন। এই হার প্রদেশের ২০২১ সালের সর্বশেষ গণভোটের চেয়ে বেশি মোট উপস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সোমবার আলবার্টানদের সামনে মোট ১০টি প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। বিচ্ছিন্নতার প্রশ্ন ছাড়াও বাকিগুলো ছিল অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং প্রদেশের সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে। ইলেকশনস আলবার্টা জানিয়েছে, বাকি প্রশ্নগুলোর ফল গণনা করতে কয়েক দিন লেগে যেতে পারে।
ভোটের আগের দিনগুলোতে প্রাদেশিক নেতা ও ফেডারেল রাজনীতিকরা ঐক্যবদ্ধ কানাডার পক্ষে প্রচারে প্রদেশ চষে বেড়িয়েছেন। এডমন্টনে বেড়ে ওঠা প্রধানমন্ত্রী কার্নি গত শুক্রবার এক সমাবেশে ভোটারদের সতর্ক করে বলেন, “এমনভাবে ভোট দিন যেন কানাডার ভবিষ্যৎ এর ওপর নির্ভর করছে, কারণ সত্যিই তা নির্ভর করছে।” তিনি আরও বলেন, কানাডার বিরুদ্ধে ভোট হলো এক বিপজ্জনক ধোঁকা, যা বছরের পর বছর গভীর অনিশ্চয়তা ও হারানো সুযোগ ডেকে আনবে।
রক্ষণশীল নেতা পিয়ের পলিয়েভ্র, যার সংসদীয় আসন এই প্রদেশেই, সমর্থকদের বলেন আলবার্টানরা “হাল ছেড়ে দেওয়ার লোক নয়”। তাঁর ভাষায়, “কানাডা কোনো সরকারের চেয়ে বড় কিছু। এটি একটি জনগোষ্ঠী, একটি পতাকা, একটি ভূমি, একটি ইতিহাস এবং একটি প্রতিশ্রুতি।”
আলবার্টা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম প্রমাণিত তেল মজুদের অধিকারী। কাউবয় সংস্কৃতির এই রক্ষণশীল ঘাঁটির রাজনৈতিক সংস্কৃতির মিল বহুদিন ধরে কানাডার বাকি অংশের চেয়ে আমেরিকান পশ্চিমের সঙ্গেই বেশি। অটোয়ার প্রতি ক্ষোভ সেখানে গভীর, যদিও তা ঐতিহ্যগতভাবে স্বাধীনতার প্রতি ব্যাপক সমর্থনে রূপ নেয়নি।
ভোটারদের কণ্ঠেও সেই মিশ্র চিত্র ধরা পড়েছে। ওয়েনরাইটের ভোটার ডাস্টিন ডেগেনহার্ডট বলেন, অটোয়া বহুদিন ধরে আলবার্টার সঙ্গে “উপনিবেশের” মতো আচরণ করছে। একই এলাকার টেইলর ম্যাকআইজ্যাক আবার বিচ্ছিন্নতার পক্ষে ভোট দিয়ে বলেন, আলাদা হলে আলবার্টার জন্যই ভালো হবে। অন্যদিকে এডমন্টনের ডেভ মালকা (৫৯) স্বাস্থ্যসেবার বদলে “গণভোটের ওপর গণভোটে” অর্থ ব্যয়ের সমালোচনা করে বলেন, ট্রাম্পের হুমকির মুখে ঐক্যবদ্ধ থাকার সময়েই নিজেদের মধ্যে লড়াই চলছে। ক্যালগেরির জেক গ্রাহাম (৩৫) আশা করেন, এই ফল বিতর্কটি দীর্ঘদিনের জন্য থামিয়ে দেবে।
প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ নিজে বিচ্ছিন্নতার বিরোধী হলেও নিজ দল ইউনাইটেড কনজারভেটিভ পার্টির ভেতরের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চাপে এই গণভোট ডেকেছিলেন। তিনি একটি জরিপের কথা উল্লেখ করেছিলেন, যেখানে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে সমর্থন ছিল মাত্র ২২ শতাংশ— যা তাঁর মতে তখনো অনেক বেশি। তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, তিনি নিজে কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দেবেন, তবে দলের নির্বাচিত সদস্যদের জন্য তা বাধ্যতামূলক করবেন না।
সাবেক প্রিমিয়ার জেসন কেনি বলেন, ঐতিহ্যগতভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলো ভোট পেত মাত্র ১ বা ২ শতাংশ। তাঁর মতে, কোভিড-১৯ বিধিনিষেধ নিয়ে ক্ষোভ কর্মীদের সংগঠিত করেছিল, যারা পরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে গ্রহণ করে। অন্যদিকে প্রস্তাবটি ব্যর্থ হওয়ার পরও বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা বলছেন, তারা একটি প্রান্তিক দাবিকে এমন এক আন্দোলনে রূপ দিয়েছেন যা হারিয়ে যাবে না। বিচ্ছিন্নতাবাদী সমর্থক জেফ র্যাথ বলেছিলেন, ৩০ শতাংশ ভোটার বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে গেলেই তিনি খুশি হতেন।
ক্যালগেরির মেয়র জেরোমি ফারকাস, স্বাধীনতা আন্দোলনের কট্টর বিরোধী, ফলাফলের আগে বলেন, অনিশ্চয়তা পুঁজি পলায়নের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, আর শহরটির “সেরা ভবিষ্যৎ এখানেই, একটি কানাডীয় শহর হিসেবে”। তিনি যোগ করেন, বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এটিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে দেখছে, তাই কোনো ফলই বিষয়টিকে স্থায়ীভাবে শেষ করে দেবে না।
সব মিলিয়ে, ফলাফল আলবার্টার বিচ্ছিন্নতা বিতর্কে আপাতত বড় ধাক্কা দিলেও রাজনৈতিক হিসাব বলছে— প্রদেশের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং অটোয়ার সঙ্গে পুরনো টানাপোড়েন সহসাই মিলিয়ে যাচ্ছে না।




