৩ ডিগ্রি উষ্ণ বিশ্বের প্রস্তুতিতে প্রথম জলবায়ু-সহনশীলতা আইন আনছে ইউরোপীয় কমিশন

ভালোর আশা, খারাপের প্রস্তুতি — এই যুক্তিতে মঙ্গলবার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি হালনাগাদ করেছে ইউরোপীয় কমিশন। প্রচণ্ড তাপ, শক্তিশালী ঝড় ও বাড়তে থাকা দাবানলের মতো ক্রমবর্ধমান দুর্যোগে ব্লকটির সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে একটি প্যাকেজ উপস্থাপন করা হয়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে ব্লকটির সহনশীলতা বাড়াতে প্রথমবারের মতো একটি আইন উন্মোচন করে ইইউ নির্বাহী বিভাগ স্বীকার করেছে, শুধু গ্রহ-উষ্ণকারী নির্গমন কমানোই যথেষ্ট নয়, কারণ জলবায়ুর চরম রূপ মহাদেশজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে।
জলবায়ু কমিশনার ওপকে হুকস্ট্রা সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্গমন আরও জোরালোভাবে কমানো এবং পূর্ণ শক্তিতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের স্বীকার করতে হবে, আমরা যে সমস্যার মুখোমুখি, তা এত বড় আকার ধারণ করেছে যে, শুধু সেটুকু করলেই দুর্ভাগ্যবশত আর চলবে না।’
প্রস্তাবিত জলবায়ু সহনশীলতা আইনে সরকারগুলোকে এমন একটি বিশ্বের জন্য পরিকল্পনা তৈরির কথা বলা হয়েছে, যা ২০৫০ সালে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শতাব্দীর শেষে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণ হবে। এটি জাতিসংঘের সর্বশেষ পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছে বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু নীতিগুলো উষ্ণায়নকে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখতে পারবে।
একই জাতিসংঘ প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বিশ্ব আর উষ্ণায়নকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখতে পারবে না, যা প্যারিস চুক্তির দ্বৈত লক্ষ্যের নিম্নসীমা; তাপমাত্রা বৃদ্ধি সর্বোত্তম ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে থামাতে হলে নির্গমনে বড় ধরনের ছাঁটাই প্রয়োজন।
কমিশন জোর দিয়ে বলেছে, মঙ্গলবারের প্যাকেজের অর্থ এই নয় যে ব্রাসেলস বিপর্যয়কর মাত্রার উষ্ণায়নের কাছে হার মেনে নিয়েছে। হুকস্ট্রা বলেন, ‘১ দশমিক ৫ ডিগ্রি নিয়ে আমি একদম স্পষ্ট করে বলি, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। একই সঙ্গে বিশ্ব এখন যে গতিপথে আছে, তার জন্য প্রস্তুতি না নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।’
প্রস্তাবিত আইনের অধীনে সরকারগুলোকে নীতি, বাজেট ও বিনিয়োগ নকশা করার সময় ৩ ডিগ্রি উষ্ণায়নের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে ‘উৎসাহিত’ করা হয়েছে। দেশগুলোকে ২০২৯ সাল থেকে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর জাতীয় জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে এবং তারপর ২০৩০ সালের শেষ নাগাদ জলবায়ু-সহনশীল পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। এসব কৌশলে নির্দিষ্ট জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কোন সরকারি কর্তৃপক্ষের, তাও উল্লেখ করতে হবে, যাতে মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে নিষ্ক্রিয়তা ও পরস্পরকে দোষারোপ এড়ানো যায়।
তুলনামূলক হালকা ধরনের এই আইন ইইউর বর্তমান মেজাজেরই প্রতিফলন। ব্রাসেলস নিজেই নিয়মকানুন শিথিল করার কর্মসূচিতে অঙ্গীকারবদ্ধ, আর জাতীয় সরকারগুলো আরও কম নিয়মের আহ্বান জানিয়েছে, বিশেষ করে জলবায়ু ও পরিবেশের ক্ষেত্রে। বন্যা প্রতিরোধ বা নগর সবুজায়নের মতো আবহাওয়ার চরম রূপের বিরুদ্ধে সহনশীলতা বাড়ানোর কাজ মূলত জাতীয় এমনকি স্থানীয় পর্যায়ের দায়িত্ব, যেখানে ইইউর ক্ষমতা সীমিত।
তবে সীমিত এই নিয়মগুলো নিয়েও এরই মধ্যে ভ্রু কুঁচকানো শুরু হয়েছে। মধ্য-ডানপন্থী ইউরোপীয় পিপলস পার্টির প্রধান জলবায়ু আইনপ্রণেতা পিটার লিসে বলেন, ‘দায়িত্বের আরও স্পষ্ট বণ্টনকে আমি জোরালোভাবে সমর্থন করি।’ তবে তিনি যোগ করেন, ‘কমিশন যে আকারে পরিকল্পনাগুলো প্রস্তাব করেছে, সেগুলো আদৌ প্রয়োজন কি না, তা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। শুধু পরিকল্পনা মানুষকে রক্ষা করে না, এবং আমরা যদি বাস্তবসম্মতভাবে নকশা না করি, তাহলে সেগুলো অকারণে সম্পদ আটকে রাখতে পারে।’
অন্যরা যুক্তি দিয়েছেন, আইনটি অত্যধিক সীমিত। গ্রিনস-সংশ্লিষ্ট আইনপ্রণেতা কাই টেগেটহফ বলেন, ‘বিপদ হলো এমন একটি কাঠামো, যা আমাদের ঠিক কতটা উন্মুক্ত অবস্থায় আছি তা বলে দেবে, অথচ আমাদের কোনো কিছুতেই অঙ্গীকারবদ্ধ করবে না। ইউরোপের দরকার বাধ্যতামূলক সহনশীলতা লক্ষ্য এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা খাতগুলোর জন্য স্পষ্ট, পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা।’
কমিশন নিজের পক্ষ থেকে জলবায়ু দুর্যোগের সম্পদ-ধ্বংসকারী হুমকি এবং জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির ব্যবসায়িক সম্ভাবনার ওপর জোর দিয়ে সরকারগুলোর অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা-সংক্রান্ত উদ্বেগকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছে। সবুজ রূপান্তরের দায়িত্বে থাকা কমিশনের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট তেরেসা রিবেরা বলেন, ‘কেউ কেউ বলতে পারেন সহনশীলতা ব্যয়বহুল। কিন্তু সঠিক প্রশ্ন হলো, অপ্রস্তুত থাকার আসল খরচ কত।’ তিনি ও হুকস্ট্রা দুজনেই উদাহরণ হিসেবে জিডিপির ওপর তাপের প্রভাবের তথ্য তুলে ধরেন। রিবেরা যোগ করেন, ‘সহনশীল না হলে ইউরোপ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না।’
মঙ্গলবার উপস্থাপিত বৃহত্তর প্যাকেজে কমিশন খরা-সহনশীল ফসল ও শীতলীকরণ সমাধানের মতো জলবায়ু প্রযুক্তির উদীয়মান বাজারকেও তুলে ধরেছে এবং ইউরোপীয় শিল্পকে সেই খাতের অগ্রণী হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
ইইউ বর্তমানে পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি বাজেট নিয়ে আলোচনা করছে বলে প্যাকেজটির সঙ্গে কোনো তহবিল যুক্ত করা হয়নি, যদিও জলবায়ু-সহনশীল প্রচেষ্টায় অর্থায়নই প্রায়ই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে থাকে। উষ্ণতর বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে ব্লকটিকে ২০৫০ সাল নাগাদ বছরে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করতে হবে, অথচ বর্তমানে তারা ব্যয় করছে মাত্র ২৯ বিলিয়ন ইউরো।
সরকারগুলোর জন্য নতুন বাধ্যবাধকতা উপস্থাপনের পাশাপাশি কমিশন ব্রাসেলসেও কাজ এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থা ব্লকজুড়ে জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন তৈরি করবে, যার পরবর্তীটি ২০২৮ সালের জুনে আসার কথা, এবং কমিশন ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ ইইউর ‘জলবায়ু সহনশীলতা-বিষয়ক কৌশলগত পরিকল্পনা’ উপস্থাপন করবে।
অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়ন করা হবে চারটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে — জলবায়ু-সংক্রান্ত মৃত্যু, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি, বিমাবিহীন ক্ষতির অংশ এবং সংশ্লিষ্ট রাজস্ব ব্যয়। আইন অনুযায়ী, কমিশনের ইউরোস্ট্যাট সংস্থা ২০৩০ সালের শেষ নাগাদ ইইউজুড়ে জলবায়ু-সংক্রান্ত মৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিসংখ্যান সংকলন শুরু করবে।
আইনি প্রচেষ্টার বাইরে ইইউ নির্বাহী বিভাগ আরও একটি বৃহত্তর প্যাকেজ উপস্থাপন করেছে, যার মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি ডিজিটাল সরঞ্জাম — যার একটি হলো ‘ক্লাইমেট ভিউয়ার’, যা নতুন উষ্ণায়ন পরিস্থিতিকে স্থানীয় পূর্বাভাসে রূপান্তর করে নীতিনির্ধারকদের ব্যবহারের জন্য। কমিশন তার ভবিষ্যৎ সব নীতি প্রস্তাবে নতুন ৩ ডিগ্রি উষ্ণায়ন পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার অঙ্গীকারও করেছে। আগামী বছরের জন্য তাপপ্রবাহ কর্মপরিকল্পনা এবং একটি জলবায়ু বিমা জোটসহ আরও পদক্ষেপের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। হুকস্ট্রা বলেন, ‘আমি বলব না যে আমরা প্রায় শেষ করে ফেলেছি। এর অনেকটাই চলমান কাজ হয়ে থাকবে।’ জলবায়ু পরিবর্তন আরও খারাপ হতে থাকলে তিনি যোগ করেন, ‘এই প্যাকেজটিকে হয়তো আরও জোরালো করতে হবে।’


