ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতি টিকে আছে, পুতিনের সঙ্গে ‘খোলামেলা’ ফোনালাপ ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের নেতাদের

রাশিয়ার দখলে থাকা দক্ষিণ ইউক্রেনের ওলেশকি শহরে স্থানীয় যুদ্ধবিরতি মঙ্গলবারও টিকে আছে বলে দেখা গেছে। আটকে পড়া প্রায় দুই হাজার বেসামরিক মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার আপাত পরিকল্পনার আগে দুই পক্ষই ড্রোন হামলা বন্ধ রেখেছে।
রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ওলেশকিতে ভোর তিনটায় এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। শহরটি নিপ্রো নদীর তীরে অবস্থিত এবং নদীর অপর পাড়ে বড় শহর খেরসন থেকে এর দূরত্ব প্রায় তিন মাইল। ইউক্রেনীয় সেনারা ২০২২ সালের শরতে খেরসন পুনর্দখল করেছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, নদীর দুই পাড়ের প্রাণঘাতী সম্মুখসারি চার বছরে প্রথমবারের মতো শান্ত ছিল। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লড়াইয়ের এই বিরতি রোববার রাত ১১টা পর্যন্ত চলার কথা এবং এটি উত্তেজনা কমার একটি তাৎপর্যপূর্ণ, যদিও সীমিত, মুহূর্ত।
ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার স্টুব এবং নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টা নিয়ে ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। তাঁরা এই আলাপকে ‘খোলামেলা ও সারগর্ভ’ বলে বর্ণনা করেছেন। স্টোরে পরে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বড় মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
দুই নর্ডিক নেতা বলেছেন, পুতিন ও পশ্চিমা নেতাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের বিরল এই ফোনালাপটি রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন আলোচনার সঙ্গে যুক্ত। সেই আলোচনা আগামী মাসে আবুধাবিতে হওয়ার কথা।
ওলেশকির যুদ্ধবিরতিকে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক ও আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুকূল মনোভাব পাওয়ার ক্রেমলিনের চেষ্টা বলে মনে হচ্ছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প এই মানবিক অভিযানের অনুরোধ করেছিলেন এবং বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হওয়ার কথা। পোপ চতুর্দশ লিও, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তা ও কাউন্সিল অব ইউরোপও যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছিল।
ওলেশকিতে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার মানুষ রাশিয়ার সম্পূর্ণ অবরোধের মধ্যে বসবাস করছেন। দোকানগুলোতে শেষবার খাবার পৌঁছেছিল মে মাসে, অনেক মানুষ এখন অনাহারে থেকে আগাছা খাচ্ছেন। ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী ড্রোন দিয়ে খাবার ফেলেছে। স্থানীয়রা বলছেন, সেই খাবার নিলে রুশ নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের আটক করে।
রুশ সেনারা সড়কে মাইন পুঁতেছেন এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবন ব্যবহার করে খেরসনের বিরুদ্ধে চব্বিশ ঘণ্টা হামলার সমন্বয় করেন। ওলেশকির কিছু বাসিন্দা রাস্তায় পড়ে থাকা মরদেহ ও পুড়ে যাওয়া বহু যানবাহনের ধ্বংসাবশেষ পাশ কাটিয়ে হেঁটে বা সাইকেলে করে পালাতে পেরেছেন।
ইউক্রেনীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, ক্রেমলিন এই সপ্তাহে একটি বড় প্রচারণা সফরের পরিকল্পনা করছে, যেখানে ওলেশকির ধ্বংসের জন্য কিয়েভকে দায়ী করা হবে। ট্রাম্প-সমর্থক মার্কিন গণমাধ্যমগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ দেখতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে; বাসে করে বাসিন্দাদের দখলকৃত ক্রিমিয়া ও রাশিয়ায় নেওয়া হবে।
এই যুদ্ধবিরতি ইউক্রেনের অন্য অংশে প্রযোজ্য নয়। রাতভর রাশিয়া কিয়েভে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, এতে অন্তত একজন নিহত ও ১৫ জন আহত হয়েছেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হামলায় শিক্ষার্থীরা আহত হয়েছেন, নিপ্রোর ওপর একটি সেতু ও মেট্রো অবকাঠামোতেও হামলা হয়েছে। আরও দশটি অঞ্চল হামলার মুখে পড়েছে। সেতুটি যান চলাচলের জন্য বন্ধ রয়েছে, কিছু যাত্রী হেঁটে সেতু পার হয়ে কাজে যাচ্ছেন।
সামাজিক মাধ্যমে ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়াকে এই যুদ্ধ টেনে নেওয়া বন্ধ করতে হবে। তিনি যুদ্ধ শেষ করার ইউরোপীয় প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়েছেন। জেলেনস্কি জানান, স্টুব ও স্টোরে পুতিনের সঙ্গে তাঁদের ফোনালাপ সম্পর্কে তাঁকে জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, আলেক্স ও ইয়োনাস রুশ নেতৃত্বের কাছে প্রকৃত উত্তেজনা-হ্রাসের পদক্ষেপের প্রয়োজন, বিশেষ করে জ্বালানি খাত ও অবকাঠামোর ক্ষেত্রে, স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
কিছু ইউরোপীয় দেশ মস্কোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথ তৈরি ও আলোচনায় ইউরোপের শক্তিশালী কণ্ঠ নিশ্চিত করার চেষ্টা বাড়াচ্ছে, তার মধ্যেই ফিনল্যান্ড-নরওয়ের এই উদ্যোগ এলো। স্টুব ও স্টোরে বলেছেন, তাঁরা নিজ নিজ দেশের নেতা হিসেবে ফোনালাপে অংশ নিয়েছেন, সমগ্র ইউরোপের পক্ষে কথা বলেননি।
এই উদ্যোগ নিয়ে মতভেদও প্রকাশ পেয়েছে। খবর প্রকাশের পরপরই ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, নরওয়ে ও ফিনল্যান্ডের এই স্বতন্ত্র উদ্যোগ নিয়ে তিনি খুবই সন্দিহান এবং এটি কারও সঙ্গে ঐকমত্য করে নেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষায়, রাশিয়া ইউরোপের সঙ্গে শান্তি চায় এমন কোনো লক্ষণ তিনি দেখেন না—প্রতিদিনের হাইব্রিড যুদ্ধেও নয়, ইউক্রেনে প্রতিদিনের নৃশংস হামলাতেও নয়।
এই মাসের শুরুতে পুতিন বলেছিলেন, তিনি শুধু রাশিয়ার কঠোর শর্তেই শান্তি আলোচনা আবার শুরু করতে রাজি। সেই শর্তের মধ্যে রয়েছে পুরো পূর্ব দনবাস হস্তান্তর, যার মধ্যে ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়া দখল করতে পারেনি এমন অংশও রয়েছে, এবং খেরসন ও জাপোরিঝিয়া প্রদেশে আরও ভূখণ্ড।
গত সপ্তাহে জেলেনস্কি এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বর্তমান সম্মুখসারি বরাবর যুদ্ধ স্থগিত করে একটি শান্তিচুক্তিতে তিনি রাজি আছেন। তিনি স্পষ্ট করেন, দখল করা ভূখণ্ডকে রুশ ভূখণ্ড হিসেবে ইউক্রেন স্বীকৃতি দেবে না।


