নিজেদের অংশের ইজতেমার তারিখ দ্রুত ঘোষণাসহ চার দফা দাবি সাদ অনুসারীদের

টঙ্গীতে আসন্ন বিশ্ব ইজতেমায় নিজেদের অংশের তারিখ দ্রুত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন তাবলিগ জামাতের মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারীরা। কাকরাইল মসজিদ ও টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানের ‘ন্যায্য বণ্টন’ এবং তাবলিগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তও চেয়েছেন তারা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। ‘তাবলীগ জামাতের বরেণ্য উলামায়ে কেরাম ও সুশীল সমাজ’ ব্যানারে সংবাদ সম্মেলনটির আয়োজন করা হয়। আয়োজকেরা নিজেদের তাবলিগ জামাত বাংলাদেশের ‘মূলধারা’ বলে পরিচয় দেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মারকাযুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া বাংলাদেশের প্রিন্সিপাল মুফতি শফিউল্লাহ মাক্কী, মারকাজুল উলুম আশ শারইয়্যাহ সাভারের জ্যেষ্ঠ মুহাদ্দিস মাওলানা গোলাম মুস্তাফা এবং তাবলিগ জামাত বাংলাদেশের মুকিম মাওলানা নূরুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান, অ্যাকাউন্টিং, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও ফার্মেসি বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের ডিন অধ্যাপক শফি উল বারীও এতে উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে চারটি দাবি তুলে ধরা হয় — মাওলানা সাদের অনুসারীদের জন্য বিশ্ব ইজতেমার তারিখ দ্রুত ঘোষণা করা; অপপ্রচার, উসকানি ও ‘একপক্ষীয় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ’ বন্ধ করা; দ্রুত বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষ করে সব হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা এবং কাকরাইল মসজিদ ও ইজতেমা ময়দানের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিশ্ব ইজতেমা দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদার অংশ। বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো মুসলমান এতে অংশ নেন। কিন্তু গত ছয়-সাত বছরে তাবলিগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ঘিরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, উসকানি ও বিতর্ক বেড়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ইজতেমার বৈশ্বিক আবেদন দুর্বল হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন আয়োজকেরা।
তারা অভিযোগ করেন, বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল ও মসজিদের মিম্বর থেকে মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে ঘিরে বিতর্কিত বক্তব্য ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। মতপার্থক্য থাকলে তা শালীন ও তথ্যভিত্তিক আলোচনায় মীমাংসা করার আহ্বান জানান তারা। প্রয়োজনে সরকারের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনার প্রস্তাবও দেন।
লিখিত বক্তব্যে টঙ্গীর সংঘর্ষের প্রসঙ্গ তোলা হয়। আয়োজকদের অভিযোগ, ওই ঘটনার আগে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল। কারা উসকানি দিয়েছেন, কারা পরিকল্পনা করেছেন এবং কারা সরাসরি জড়িত ছিলেন, তা উদ্ঘাটনে তারা আবারও বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন।
২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর ভোরে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দান দখলকে কেন্দ্র করে তাবলিগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত তিনজন নিহত হন। আহত হন শতাধিক মুসল্লি। এর আগে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছিলেন।
আয়োজকেরা আরও দাবি করেন, বিভিন্ন জেলায় তাদের ছয়জন সাথিকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তিরা মুন্সিগঞ্জ, নোয়াখালী, ফরিদপুর, কুড়িগ্রাম, কিশোরগঞ্জ ও ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার বাসিন্দা। অথচ উল্টো তাদেরই আসামি করা হয়েছে এবং ‘খুনি’ বলে প্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা। অভিযোগের নিষ্পত্তি আদালত ও আইনানুগ প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন আয়োজকেরা।
সংবাদ সম্মেলনে জুবায়েরপন্থি এক শীর্ষ নেতার বক্তব্যেরও প্রতিবাদ জানানো হয়। আয়োজকদের দাবি, গত ২৪ অক্টোবর ওই নেতা তাবলিগ জামাত বাংলাদেশের আমির সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলামের প্রয়াত স্ত্রীকে নিয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন। তারা ওই বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোন পক্ষ কী সুবিধা পেয়েছে, সে বিষয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাইয়ের আহ্বানও জানান তারা।
আগামী বিশ্ব ইজতেমার তারিখ নিয়ে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ২০২৭ সালের ইজতেমা দুই পর্বে হবে। প্রথম পর্ব ৮ থেকে ১০ জানুয়ারি, দ্বিতীয় পর্ব ১৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি। সে সময় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, প্রথম পর্বে জুবায়েরপন্থি এবং দ্বিতীয় পর্বে সাদপন্থিরা অংশ নেবেন।
তবে অক্টোবরের শুরুতে ‘ওলামা মাশায়েখ বাংলাদেশ’ এক বিবৃতিতে দাবি করে, দুই পর্বই হবে শূরায়ে নেজাম বা জুবায়েরপন্থিদের ব্যবস্থাপনায়। অন্যদিকে সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম ও তার ছেলে এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, ২০২৭ সালের ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি সাদপন্থিদের আলাদা ইজতেমার আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই দাবির বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিপরীত অবস্থানে রয়েছেন জুবায়েরপন্থি আলেমেরা। গত ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ওলামা-মাশায়েখ বাংলাদেশের এক সম্মেলনে সাদপন্থিদের টঙ্গীর ময়দানে প্রবেশ স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ রাখার দাবি জানানো হয়। তাদের যুক্তি, পূর্ববর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৫ সালের ইজতেমাই ছিল টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থিদের শেষ ইজতেমা। সম্মেলনে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংঘর্ষে নিহতদের ঘটনার দ্রুত বিচারও দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সরকার, বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দল, আলেম, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতি একটি আহ্বান জানান আয়োজকেরা। তারা বলেন, দলীয় বা গোষ্ঠীগত বিরোধের বাইরে রেখে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ইজতেমা নিয়ে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।



