এক গ্রীষ্মের দাবদাহে ইউরোপে ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু, অর্থনৈতিক ক্ষতি ১৭ বিলিয়ন ইউরো

গ্রীষ্মের দাবদাহে ইউরোপজুড়ে ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট দেশজ উৎপাদন কমেছে প্রায় শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ১৭ বিলিয়ন ইউরো।
দুটি পৃথক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার ফলাফল বলছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ইউরোপ কতটা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণ বছর হতে যাচ্ছে ২০২৬, এমন পূর্বাভাসের মধ্যে ইউরোপের এই চিত্র সামনে এল।
গত শুক্রবার প্রকাশিত একটি গবেষণায় তাপজনিত মৃত্যুর হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রীষ্মকালে উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই জলবায়ু পরিবর্তন না হলে ঘটত না।
অন্যদিকে ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপের জিডিপিতে দাবদাহের আঘাত গত এক দশকের একই সময়ের গড় ক্ষতির তুলনায় আড়াই গুণ।
একের পর এক রেকর্ড ভাঙা দাবদাহের কারণে মৃত্যুর সামগ্রিক সংখ্যা আগের সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ছিল। গবেষণাটি চলতি সপ্তাহে নেচার হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত হওয়ার কথা। এতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে ইউরোপের শহরগুলোতে তাপজনিত কারণে প্রায় ২৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ২০০৩ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ২৮ হাজার।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষক এবং গবেষণাটির প্রধান লেখক ক্লেয়ার বার্নস এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বারবার দাবদাহের মুখোমুখি হতে হয়েছে। মানবসৃষ্ট উষ্ণায়নের কারণে বাড়তি তাপমাত্রা না থাকলেও এসব ঘটনা বিপজ্জনক হতো, কিন্তু উষ্ণায়নে তাপমাত্রা আরও বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সত্যিই অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
পুরো গ্রীষ্মজুড়েই ইউরোপের দেশগুলোতে চরম তাপমাত্রা দেখা গেছে। মে মাসে শুরু হওয়া দাবদাহ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। অনেক দেশে তাপমাত্রার আগের রেকর্ড বড় ব্যবধানে ছাড়িয়ে যায়। পশ্চিম ইউরোপে ১৯৯১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত গ্রীষ্মের গড় তাপমাত্রার তুলনায় এবার গড় তাপমাত্রা প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কোনো কোনো দিনে তাপমাত্রার ব্যবধান ছিল ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত।
দাবদাহে পুরো মহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দাবানলে বাড়িঘর পুড়ে গেছে, অতিরিক্ত গরমে হাসপাতালের ভেতরের তাপমাত্রা বেড়েছে, পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে এবং ফ্রিজ ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের শীতলীকরণব্যবস্থা বিকল হয়ে পড়েছে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের প্রতিবেদনটির লেখক উলরিখ এবারলে জানান, চরম তাপমাত্রার কারণে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ফ্রান্সের জিডিপি শূন্য দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। একই সময়ে জার্মানির অর্থনীতি শূন্য দশমিক ১ শতাংশ ছোট হয়েছে। আর স্পেনের জিডিপিতে দাবদাহের প্রভাব ছিল শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের যৌথ গবেষণায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও নরওয়ের ৩০টি দেশের ৮৫৪টি শহর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব শহরের জনসংখ্যা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ।
গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে নির্গত গ্যাস তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ায় এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ২০০৩ সালে অতিরিক্ত মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী ছিল। এ বছর গ্রীষ্মে সেই হার বেড়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে দাঁড়িয়েছে।
তাপজনিত মৃত্যুর সঠিক হিসাব করা কঠিন। কারণ, মানুষ সাধারণত সরাসরি তাপের সংস্পর্শে এসে মারা যায় না। বরং অতিরিক্ত তাপমাত্রা শরীরের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে এবং আগে থেকে থাকা বিভিন্ন রোগের অবস্থা আরও খারাপ করে দেয়। বিশেষ করে হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
বুধবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইম্পেরিয়াল কলেজ হেলথকেয়ার এনএইচএস ট্রাস্টের নিবিড় পরিচর্যা বিভাগের পরামর্শক অ্যান্ড্রু হার্টল বলেন, প্রায়ই দেখা যায় বয়স্ক রোগীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন, তাঁদের স্ট্রোক হচ্ছে কিংবা হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে তাপমাত্রা মৃত্যুর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি আরও বলেন, ময়নাতদন্ত করে কেউ অতিরিক্ত গরমে ছিলেন কি না, তা জানা যায় না।
যুক্তরাজ্যের পরিবেশ নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান টবি পারকিনস বলেন, বয়স্ক, অসুস্থ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মতো সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সুরক্ষা দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে তীব্র গরমে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের নিরাপদ রাখতে সহায়ক অবকাঠামো যাতে ভেঙে না পড়ে, তা ঠেকাতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
২০২৬ সালের তুলনায় আগামী বছর আরও বেশি গরম পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বুধবার জাতিসংঘ জানিয়েছে, প্রাক্শিল্পায়ন যুগের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়া এখন প্রায় অনিবার্য।




