দেশি অ্যান্টিভেনমের গবেষণা থমকে আছে দুই বছর: রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিবডি তৈরি হলেও মেলেনি অর্থ বরাদ্দ

রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিভেনম বা প্রতিষেধক তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়, অ্যান্টিবডি উৎপাদনের কাজ শেষ করে সরকারের কাছে দুই বছর আগে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বাংলাদেশের ভেনম রিসার্চ সেন্টার। কিন্তু কোনো অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় থমকে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির সব গবেষণা কার্যক্রম।
২০১৮ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে ভেনম রিসার্চ সেন্টারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি দেশে এ ধরনের একমাত্র প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সেন্টারটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অপারেশনাল প্ল্যানের অধীনে পরিচালিত হচ্ছিল।
সেন্টারের মুখ্য গবেষক ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক অনিরুদ্ধ ঘোষ জানান, ২০২৪ সালের ৩০ জুনের পর থেকে সরকার আর কোনো অর্থ অনুমোদন না দেওয়ায় তহবিলের অভাবে বর্তমানে গবেষণা কার্যক্রম প্রায় থমকে গেছে। তাঁর ভাষায়, অপারেশনাল প্ল্যান দিয়ে আর চলবে না বলে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর ২০২৪ সালের পরে আর কোনো অপারেশনাল প্ল্যান পাস না হওয়ায় তাদের ফান্ডিং বন্ধ হয়ে গেছে।
২০২৩ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর সাড়ে চার লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং এতে সাড়ে সাত হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন, যার মধ্যে ১৮ লাখ থেকে ২৭ লাখ ক্ষেত্রে সাপের বিষ শরীরে প্রবেশ করে। ২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাপের কামড়কে ‘চরম উপেক্ষিত’ সমস্যা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
২০২৩ সালে করা জাতীয় সর্পদংশন-সংক্রান্ত জরিপে পাওয়া গেছে, দেশে সাপের কামড়ের এক-চতুর্থাংশ ঘটনায় বিষধর সাপ জড়িত এবং গ্রামীণ এলাকায় সাপের কামড়ের ৯৫ শতাংশ ঘটনা ঘটে। বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব বাড়ে; রাসেলস ভাইপার, কালকেউটে, গোখরা ও চন্দ্রবোড়ার মতো সাপের দংশনে বর্ষাকালে মানুষ মারা যাওয়ার খবর প্রায়ই শোনা যায়।
একই গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ সাপের কামড়ের স্থানে গিঁট দেন। চিকিৎসকের বদলে ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভরতার কারণে দেশে প্রতি বছর ছয় হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। সরকারি জরিপ অনুযায়ী, সাপে কাটা রোগীদের ৮৬ শতাংশ অপচিকিৎসার শিকার হন, মাত্র তিন শতাংশ মানুষ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যান।
গবেষকরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে দক্ষিণ ভারত থেকে আনা অ্যান্টিভেনম দিয়ে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা করা হয়। ওই অ্যান্টিভেনম ভারতীয় প্রজাতির সাপের বিরুদ্ধে তৈরি, যা দেশের স্থানীয় সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করতে বৈজ্ঞানিকভাবে পুরোপুরি কার্যকর নয়।
অধ্যাপক অনিরুদ্ধ ঘোষ জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে দিয়েছে, সব দেশকেই তাদের অঞ্চলের সাপের বিষ ব্যবহার করে অ্যান্টিভেনম তৈরির চেষ্টা করতে হবে, তাহলে সেই অ্যান্টিভেনম অনেক বেশি নির্দিষ্টভাবে কাজ করবে। তিনি বলেন, ‘আমরা রাসেলস ভাইপারের অ্যান্টিবডি তৈরি করে ওইটার রিপোর্টসহ সরকারের কাছে জমা দিয়েছি।’
সেন্টারের পরবর্তী লক্ষ্য ছিল ক্রেইট (কালকেউটে) ও কোবরার মতো যেসব সাপের কামড়ে স্নায়ুতন্ত্র অবশ হয়ে যায়, সেগুলোর অ্যান্টিবডি উৎপাদন এবং তা বিষকে নিষ্ক্রিয় করে কি না, তা দেখা। কিন্তু অর্থায়ন না থাকায় এই কাজ এখনো শুরু করা যায়নি বলে জানান অধ্যাপক ঘোষ। অ্যান্টিবডি তৈরির আগে সাপের ‘ভেনম ক্যারেক্টারাইজেশন’ করতে হয়, সেই কাজের মতো অর্থও তাদের কাছে নেই; তাঁর ভাষায়, তারা কোনোরকমে বেঁচে আছেন গত দুই বছর ধরে।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাড়ে তিন শতাধিক বিষধর সাপ সংগ্রহ করেছে ভেনম রিসার্চ সেন্টার। তবে অর্থায়নের অভাবে গত দুই বছর কোনো সাপ সংগ্রহ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। সেন্টারের ইনভেস্টিগেটর ও সুপারভাইজার এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী জানান, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বিষধর ১১ প্রজাতির সাপের বিষ সংগ্রহ করা হয়েছে — এর মধ্যে রয়েছে দুই প্রজাতির কোবরা, এক প্রজাতির কিং কোবরা, পাঁচ প্রজাতির ক্রেইট, এক প্রজাতির রাসেলস ভাইপার ও দুই প্রজাতির পিট ভাইপার।
অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, ক্রেইটজাতীয় সাপ থেকে বিষ সংগ্রহ করা খুবই কঠিন। অ্যান্টিভেনম তৈরির কাজ শুরু করতে কমপক্ষে পাঁচ মিলিগ্রাম বিষ লাগে; এক হাজার ক্রেইট ছয় মাস লালন-পালন করে প্রতি মাসে বিষ সংগ্রহ করলেও হয়তো পাঁচ মিলিগ্রাম আসতে পারে, কারণ ক্রেইট থেকে এক ফোঁটার মতো সামান্য বিষ পাওয়া যায়। সেন্টারে লালন-পালন করা সাপগুলোর জন্য সেখানেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইঁদুর প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে; অধ্যাপক ঘোষ জানান, এতে প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ টাকার মতো খরচ হয়।
ভারত থেকে কেনা অ্যান্টিভেনম সম্পর্কে অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, সেটি মূলত চারটি সাপের বিষ একসঙ্গে করে তৈরি — একটি কোবরা, একটি ক্রেইট ও দুইটি ভাইপার (রাসেলস ভাইপার ও স-স্কেলড ভাইপার), যাদের ভারত ‘বিগ ফোর’ বলে। চারটির মধ্যে তিনটি সাপ বাংলাদেশে আছে, শুধু স-স্কেলড ভাইপার বাংলাদেশে নেই। পরিবেশগত কারণে দক্ষিণ ভারতের একই প্রজাতির কোবরা আর বাংলাদেশের কোবরার বিষের মিল নেই; দক্ষিণ ভারতের স্থানীয় সাপের বিষ থেকে তৈরি অ্যান্টিভেনম সেখানকার স্থানীয় বিষের বিরুদ্ধেই বেশি ভালো কাজ করবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশীদ জানিয়েছেন, অপারেশনাল প্ল্যানের অধীনে থাকা প্রকল্পগুলোকে রেভিনিউ খাত ও ডিপিপির আওতায় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ভেনম রিসার্চ সেন্টারের অর্থায়ন আপাতত বন্ধ থাকবে, কারণ এর অর্থায়ন কোন খাত থেকে হবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। তাঁর ভাষায়, প্রকল্পটি ডিপিপি নাকি রেভিনিউ খাতের অধীনে যাবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি; প্রকল্প থেকে ডিজির কাছে চিঠি দেওয়া হলে হয়তো ডিজি তা আমলে নিয়ে ব্যবস্থা করবেন।
অধ্যাপক ঘোষ জানান, এরই মধ্যে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল বা ডিপিপি প্রণয়নের চেষ্টা আবার শুরু করেছে সরকার। তারা ডিপিপি তৈরি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্ল্যানিং কমিশন পার হয়ে চূড়ান্তটি আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জমা দিয়েছেন; সেখান থেকে তা আবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যাবে এবং পাস হলে তখন সরকারি ফান্ডিং আসবে। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাপে কাটাকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে অভিহিত করে ২০৩০ সালের মধ্যে সাপের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে সদস্য দেশগুলোকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।



