লালমাটিয়ায় এক বর্গকিলোমিটারের কম এলাকায় ৩০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চাপে আবাসিক জীবন

রাজধানীর লালমাটিয়া আবাসিক এলাকায় ঘর থেকে বেরোলেই চোখে পড়ে একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সড়কের এ পাশে একটি স্কুল তো ওপাশে আরেকটি। একই ব্লকে কয়েক পা হাঁটলেই দেখা মিলছে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানের। কোথাও বাংলা মাধ্যম, কোথাও ইংরেজি মাধ্যম, কোথাও মাদ্রাসা, আবার কোথাও কোচিং সেন্টার।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তথ্য অনুযায়ী, লালমাটিয়া আবাসিক এলাকার আয়তন মাত্র শূন্য দশমিক ৭৩ বর্গকিলোমিটার। এই ছোট এলাকায় সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, কোচিং সেন্টার ও নানা ধরনের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
সম্প্রতি একদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত লালমাটিয়ার বিভিন্ন ব্লক ঘুরে ৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া যায়। স্থানীয় রিকশাচালক দেলোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে জাকির হোসেন রোড ধরে সি ব্লকে ঢুকতেই একের পর এক স্কুল চোখে পড়ে। একই সড়কে কয়েক পা হাঁটলেই পাওয়া যায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
সরেজমিনে দেখা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে লালমাটিয়া সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও লালমাটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ ছাড়া রয়েছে লালমাটিয়া গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ফাউন্ডেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বেঙ্গলি মিডিয়াম হাই স্কুল ও সহজ পাঠ উচ্চবিদ্যালয়।
ইংরেজি মাধ্যম ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে অ্যাভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, কোকাবুররা অস্ট্রেলিয়ান স্ট্যান্ডার্ড স্কুল, সেন্ট পল’স স্কুল, অ্যাকাডেমিয়া, অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ওয়েটন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ক্রেস্টউড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, ম্যাংগ্রোভ স্কুল, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া স্কুল, এক্সিলেন্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, লিজেন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও প্রিমিয়ার স্কুল, ঢাকা। সরেজমিনে অ্যাভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অন্তত ছয়টি ক্যাম্পাস দেখা গেছে এই এলাকায়।
ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে জামিয়া ইসলামিয়া, মাদ্রাসা নূরে মদিনা, মাশকুল কোরআন, মাদরাসাতুল কলম ও ইসলামিয়া মাদ্রাসা। স্কুলের বাইরে আছে শান্ত-মারিয়াম ইনস্টিটিউট অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, ফিউচার ব্যারিস্টার্স অ্যাকাডেমি ও বিভিন্ন কোচিং সেন্টার। এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সঙ্গে এডুকেট অ্যাকাডেমি নামে একটি কোচিং সেন্টারও পরিচালিত হয় এলাকায়।
লালমাটিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন, অনুমোদিত ক্যাম্পাসের সংখ্যা ও শিক্ষাক্রম সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও নিবন্ধনের অবস্থা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব দেখার কেউ নেই।
লালমাটিয়ার ডি ব্লকে আলোচিত ‘পিস স্কুল’-এর কার্যক্রম চলতে দেখা গেছে। ২০১৬ সালের আগস্টে বিতর্কিত কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় লালমাটিয়ার পিস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পাঠদানের অনুমতি বাতিলের নির্দেশ দেয়। পরে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড স্কুলটির সাময়িক নিবন্ধন বাতিল করে। পিস স্কুল বন্ধ হওয়ার পর আগের ভবনটি ভেঙে সেখানে অ্যাভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে ডি ব্লকে পরিচালিত পিস স্কুলটির নিবন্ধন ও অনুমোদনের অবস্থা যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটির নিরাপত্তা কমিটির সভাপতি বেলাল আহমেদ বলেন, ‘লালমাটিয়ায় কোচিং সেন্টার ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সংখ্যা এত বেড়ে গেছে যে, আমরা এলাকাবাসী এখন অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছি। এসব প্রতিষ্ঠানের কারণে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। স্কুলের ক্লাস শুরু ও ছুটির সময় সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়।’ তিনি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের উদ্যোগ এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা চেয়েছেন।
লালমাটিয়ায় সেদিন ব্যক্তিগত কাজে আসা ব্যান্ড ‘অ্যাশেজ’-এর ড্রামার তৌফিক আহমেদ বিজয় বলেন, ‘এখানে কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, তা সরকারের ঠিক করা উচিত। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলো কত টাকা টিউশন ফি নিতে পারবে, সেটিও নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এখানে জনঘনত্ব বেশি, রাস্তাও চাপা। স্কুল ছুটি হলে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়।’ তবে যানজটের জন্য শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেননি তিনি; ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ফুটপাত দখলকেও কারণ বলেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এফ ব্লকের এক বাসিন্দা জানান, স্কুলের সামনে যানজট, ফুটপাত দখল ও সড়কের ওপর চাপ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানতে চান, লালমাটিয়ায় কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, কোনগুলোর নিবন্ধন ও অনুমোদন আছে, এক নিবন্ধনের আওতায় একাধিক ক্যাম্পাস পরিচালিত হচ্ছে কি না এবং আবাসিক এলাকায় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের শর্ত মানা হচ্ছে কি না।
বাংলা মাধ্যমের বেসরকারি বিদ্যালয়ের অনুমোদন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে দায়িত্বে পরিবর্তন এসেছে। ২০২২ সালের নীতিমালায় এসব অনুমোদনের চূড়ান্ত দায়িত্ব শিক্ষা বোর্ডের হাতে দেওয়া হয়। তবে ২০২৬ সালের ৫ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে এসব অনুমোদনের দায়িত্ব ন্যস্ত করে অফিস আদেশ জারি করা হয় এবং ২৯ জুলাই একই বিষয়ে সংশোধিত আদেশ প্রকাশ করা হয়। এর পরও মন্ত্রণালয় শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের দিয়ে বিদ্যালয় সরেজমিন পরিদর্শন ও আবেদন যাচাইয়ের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।




