কক্সবাজারে অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্টে নেই অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ও জরুরি পথ, টুপটুপে ১০ মৃত্যুর পর তৎপর প্রশাসন

কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে ঘুম ভাঙে মেহেরুননেসা মিলার (৩০) আগুনের তাপে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পাশের কক্ষে থাকা স্বজনদের খোঁজ নেওয়ারও সুযোগ পাননি তিনি। জানালার কাচ ভেঙে দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে প্রাণে বাঁচেন তিনি ও তাঁর স্বামী মাসুদ মিয়া। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন আরেক স্বজন আশিকুল ইসলাম। তিনজনই আহত হন।
১৭ অক্টোবর কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে ছয়জনই মেহেরুননেসা মিলার স্বজন। তাঁরা রাজধানীর খিলগাঁওয়ের পশ্চিম নন্দীপাড়ার বাসিন্দা। খালাতো ভাই-বোন মিলে ৯ জন অবকাশযাপনে কক্সবাজারে এসেছিলেন। ঘটনার দিনই তাঁদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল।
রিসোর্টে স্ত্রীকে হারিয়ে প্রাণে বেঁচে ফেরা আশিকুল ইসলাম বলেন, ‘রিসোর্টটিতে জরুরি বের হওয়ার রাস্তা ছিল না। আমরা তিনজন জানালার কাচ ভেঙে বাইরে লাফ দিয়ে বেঁচে যাই।’ কাঠ-বাঁশের তৈরি রিসোর্টটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর অন্য স্বজনদের পুড়ে মরার দৃশ্য দেখতে হয় তাঁদের।
এই অগ্নিকাণ্ডের পর দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে অবকাশযাপন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শুধু টুপটুপ নয়, পর্যটনশিল্পের বিস্তারের সঙ্গে কক্সবাজার শহর, মেরিন ড্রাইভ ও সেন্ট মার্টিনে গড়ে ওঠা কয়েক শ হোটেল ও রিসোর্টে ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মকানুন না মেনে গড়ে ওঠা এসব স্থাপনার অনেকগুলোতে নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। অগ্নিকাণ্ড কিংবা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার জরুরি পথও নেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে।
হোটেল মালিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে প্রতিবছর বেড়াতে আসেন ৮০ থেকে ৯০ লাখ পর্যটক। এক দশক ধরে শহরের পাশাপাশি পাহাড় ও সমুদ্রঘেঁষা মেরিন ড্রাইভ এলাকায়ও পর্যটনের বিস্তার ঘটেছে। এসব এলাকার সাত শতাধিক আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের বিরুদ্ধে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
কক্সবাজারে কর্মরত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আহমদ গিয়াস বলেন, তারকা মানের হোটেল ছাড়া অধিকাংশ হোটেলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। পয়ঃশোধনাগারও নেই। এমনকি দুর্ঘটনার সময় বের হওয়ার জরুরি পথও অনেক প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত। প্রশাসনের নজরদারির অভাবে দিনের পর দিন এসব প্রতিষ্ঠান চলছে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স শাখার পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম জানান, তারকা মানের সব হোটেলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রয়েছে। মাঝারি মানের ৫৩টি হোটেল-রিসোর্ট অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে। যাচাই-বাছাই শেষে ২৩টিকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। অন্যদের নোটিশ দেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) সচিব সানজিদা বেগম বলেন, ‘অধিকাংশ হোটেলের অগ্নিনির্বাপকের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকবল না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রায় সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় বিষয়গুলো নজরে আসে।’ কউকের তথ্য অনুযায়ী, মেরিন ড্রাইভ সড়কে দোকানপাটসহ প্রায় ২ হাজার ৫০০টি স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৫০টি অবৈধ প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর চলতি বছরের এপ্রিল থেকে পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে ২৬টি রিসোর্ট ও ১০টি রেস্তোরাঁকে নোটিশ দিয়েছে। টুপটুপ রিসোর্টসহ ১৪টি রিসোর্টকে জরিমানাও করা হয়েছে। অনুমোদনবিহীন স্থাপনা সরিয়ে ফেলার জন্য সম্প্রতি ২৫০টি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন। তিনি বলেন, শিগগির সব ধরনের অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১৯৯৯ সালে কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। এসব এলাকায় স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ অনুযায়ী ২০টির বেশি কক্ষ রয়েছে—এমন রিসোর্টের পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, মাত্র ৪৪টি হোটেল-রিসোর্টের পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে। আর পয়ঃশোধনাগার বা স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট রয়েছে মাত্র ১৪টি প্রতিষ্ঠানে।
প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, ‘একটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের জন্য কমপক্ষে ১৭-১৮টি সরকারি দপ্তরে দৌড়াতে হয়। এতে উদ্যোক্তারা নানা হয়রানির শিকার হন। এই অবস্থায় কেউ কেউ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবৈধ হোটেল-রিসোর্ট বানাচ্ছে। টুপটুপের ঘটনা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল কক্সবাজারের পর্যটনশিল্প কতটা অনিরাপদ।’
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান বলেন, ‘জনবলসংকটের কারণে সব অবৈধ স্থাপনা ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এখন কউক ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে যেসব অনিয়ম চিহ্নিত হচ্ছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ গত শনিবার কক্সবাজারে নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন পর্যটনসংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। বৈঠকে হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর মালিকেরা অগ্নিনির্বাপণ লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ নানা অনিয়ম সারাতে ছয় মাস সময় চেয়েছেন। একই সঙ্গে পর্যটন ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজলও নিরাপদ পর্যটন নগরী গড়ে তোলার জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার চালুর পক্ষে মত দেন।
জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘এ দাবি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কমিটির সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এ ছাড়া নিরাপদ পর্যটন নিশ্চিত করতে যেসব অবৈধ হোটেল-রিসোর্টের ন্যূনতম নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই, সেসবের বিরুদ্ধে শিগগির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’




