একসময় রুজভেল্টের দুর্গ, এখন ট্রাম্পের শক্ত ঘাঁটি: ক্যালিফোর্নিয়ার শাস্তা কাউন্টির বদলে যাওয়া গল্প
প্রায় এক শতাব্দী আগে ক্যালিফোর্নিয়ার শাস্তা কাউন্টিতে ফ্রাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট পেয়েছিলেন ৭২ শতাংশের বেশি ভোট। আজ সেই একই কাউন্টি যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'মাগা' আন্দোলনের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, যেখানে ২০১৬, ২০২০ ও ২০২৪ — টানা তিনটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন।
গল্পের শুরু ১৯৩২ সালের মহামন্দার দিনগুলোতে। তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ বেকার। ক্যালিফোর্নিয়ার রাজধানীতে অস্থায়ী কাজের জন্য মানুষের মধ্যে মারামারি পর্যন্ত হয়েছে — ১৯৩১ সালের শুরুতে গ্রানাইট বহনের কয়েকটি সাময়িক কাজের জন্য প্রায় ২০০ মানুষের মধ্যে সংঘর্ষের খবর ছেপেছিল স্যাক্রামেন্টো বি পত্রিকা।
উত্তরের প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি ছিল আরও খারাপ; সুযোগ কম, ত্রাণ পৌঁছাত দেরিতে। স্বর্ণের খনির জন্য ১৮৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত শাস্তা কাউন্টি তামা খনি, কৃষি ও কাঠশিল্পের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, আর মন্দায় সেই অর্থনীতিই ভেঙে পড়েছিল। কর্মহীন মানুষ আবার পাহাড়ে ফিরে গিয়েছিলেন সোনার খোঁজে — এক তরুণ ১৯৩১ সালে এক প্রতিবেদককে বলেছিলেন, গত মাসে তিনি ১৮ ডলার ৯০ সেন্টের সোনা তুলেছেন; ধনী হননি, কিন্তু খেতে পারছেন, বেকার ও ক্ষুধার্ত থাকার চেয়ে তা-ই ভালো।
রুজভেল্ট আশা ও সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রচারণায় তিনি ৪১টি অঙ্গরাজ্য ঘুরেছিলেন, ছোট শহর ও গ্রামে যাওয়ার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। ১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বরে শাস্তার কাউন্টি আসন রেডিংয়ে তিনি থামলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, ক্লাস শেষ হয় আগেভাগে, যাতে সবাই তাঁর বক্তব্য শুনতে পারে।
ট্রেনের পেছন থেকে কয়েক হাজার মানুষের সামনে রুজভেল্ট বলেছিলেন, এই সফর তিনি রাজনীতির জন্য করছেন না; করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি এলাকার অবস্থা ও প্রয়োজন জানতে। তাঁর ভাষায়, লড়াইটি রিপাবলিকান দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং সেই রিপাবলিকান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে, যারা দেশকে এই অবস্থায় এনেছে।
বার্তাটি কাজ করেছিল। রিপাবলিকানদের দাবি সত্ত্বেও ক্যালিফোর্নিয়া ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকে পড়ে, আর শাস্তায় রুজভেল্ট পান ৭২ শতাংশের বেশি ভোট। এই ফল আজ কল্পনা করা কঠিন: শাস্তা এখন কার্যত ক্যালিফোর্নিয়ার মাগা রাজধানী এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন-অস্বীকার আন্দোলনের একটি কেন্দ্র।
মহামারির সময় কোভিড বিধিনিষেধের প্রতি বৈরিতার জন্য এলাকাটি জাতীয় মনোযোগ কেড়েছিল। পরের বছরগুলোতে আরও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে — স্থানীয় রক্ষণশীল গোষ্ঠীর বৈঠক কভার করার সময় এক সাংবাদিক লাঞ্ছিত হয়েছেন, আর জনসভায় এক নির্বাচিত কর্মকর্তার পদত্যাগ দাবিতে প্ল্যাকার্ড ধরায় এক প্রতিবাদকারী কারাদণ্ডের মুখে পড়েছিলেন বলে খবরে এসেছে।
এক বছরের বেশি সময় ধরে দ্য গার্ডিয়ান বিংশ শতাব্দীজুড়ে এই এলাকায় ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক রূপান্তর অনুসন্ধান করেছে। দীর্ঘদিনের বাসিন্দা, ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা হলো — প্রধান শিল্পগুলোর পতনের মধ্যে একটি জনপদ নাটকীয়ভাবে ডানদিকে ঝুঁকেছে এবং উগ্র রক্ষণশীল রাজনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
এই গল্প শুধু শাস্তার নয়, ডেমোক্র্যাটিক পার্টিরও। শাস্তাকে দেখা হচ্ছে একটি কেস স্টাডি হিসেবে — কীভাবে ডেমোক্র্যাটরা তাদের একসময়ের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি, গ্রামীণ আমেরিকাকে ফিরে পেতে হিমশিম খাচ্ছে, যদিও আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ আসন ফিরে পাওয়ার পথে তারা এগিয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে।
কটনউড নামের ছোট জনপদটি তার পশ্চিমা সৌন্দর্য, মাছের হ্যাচারি আর ডানপন্থি মিলিশিয়ার জন্য পরিচিত। গভীর রিপাবলিকান কাউন্টির মধ্যেও এই এলাকা রক্ষণশীলতায় আলাদা। রাস্তার পাশে পুরোনো সাইনবোর্ডে দেখা যায় বিতর্কিত 'মেজার বি'র কথা — জুনে ভোটারদের অনুমোদন পাওয়া এই উদ্যোগ প্রায় সব ডাক-ভোট শেষ করে ভোটার পরিচয়পত্র ও হাতে গণনা বাধ্যতামূলক করতে চেয়েছিল; রাজ্যের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ের মধ্যে এক বিচারক এর কার্যকর হওয়া ঠেকিয়ে দিয়েছেন।
কাছেই স্যাক্রামেন্টো নদীর ধারে ৮২ বছর বয়সী প্যাট কারের বাড়ির অফিস যেন এক ভুলে যাওয়া ইতিহাসের জাদুঘর — দেয়ালে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের পুরোনো ছবি, হোয়াইট হাউস কর্মকর্তাদের চিঠি, এমনকি এক সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতির চিঠিও। এই দলিলপত্র একটি গভীর নীল অঞ্চলের ছবি আঁকে, যা গড়ে উঠেছিল ডেমোক্র্যাটদের নীতির ওপর ভর করে।
কারের ভাষায়, এখনকার মানুষকে এ কথা বোঝাতে গেলে তারা বলে, 'এটা হতেই পারে না, এমন ছিল নাকি?' যাঁরা সেই স্বর্ণযুগের কথা মনে করতে পারেন, তাঁদের প্রায় সবাই আজ মৃত। বিংশ শতাব্দীতে শাস্তার বাসিন্দারা অঙ্গরাজ্য ও ফেডারেল রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সভাপতিত্বও করেছেন।
প্রশ্ন এখন একটাই: ডেমোক্র্যাটরা কি কখনো এই গ্রামীণ, শ্রমজীবী ভোটারদের ফিরে পাবে, যাদের ওপর তারা একসময় নির্ভর করত? শাস্তার গল্প বলছে, শিল্পের পতন আর কয়েক দশকের অর্থনৈতিক বদল একটি জনপদের রাজনীতিকে কত গভীরভাবে পাল্টে দিতে পারে — এবং সেই পালাবদল উল্টানো মোটেই সহজ কাজ নয়।




