ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা তৈরি সেন্টকমের, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পেন্টাগন
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানে নতুন করে হামলার বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করেছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে। প্রায় আট মাস ধরে চলা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তুতি আরেক দফা বড় সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ওয়েবসাইট দ্য হিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর তত্ত্বাবধানকারী সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) হোয়াইট হাউস অনুমোদন দিলে পরবর্তী হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত রেখেছে। সামরিক পরিকল্পনাকারীরা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের জন্য বেশ কয়েকটি বিকল্পও তৈরি করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনগুলোর মূল কেন্দ্র ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরের সম্ভাব্য হামলা। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘আগামীকাল’ই হামলা চালাতে পারে, আবার তেহরানের সঙ্গে একটি ‘বড়, সুন্দর’ চুক্তির সম্ভাবনার কথাও তিনি বলেছেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অন্যদিকে ওয়াশিংটনকে আলোচনা ভেস্তে দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছেন, তবে চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন। দুই পক্ষই আরও হামলার হুঁশিয়ারি দেওয়ায় সংঘাত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ফিরে যেতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
সর্বশেষ প্রতিবেদনগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, সামরিক প্রস্তুতি এগিয়ে চলেছে, যদিও ট্রাম্প কোন বিকল্প অনুমোদন করবেন বা কখন করবেন, তা স্পষ্ট নয়। এই মাসের শুরুতে অ্যাক্সিওস জানিয়েছিল, পেন্টাগন সেন্টকমকে বড় ধরনের যুদ্ধ অভিযান পুনরায় শুরু করার সম্ভাব্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে নির্দেশ দিয়েছে; তাদের সূত্র অনুযায়ী, নতুন অভিযান ইরানের জ্বালানি স্থাপনা, অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করতে পারে।
তবে এই প্রস্তুতি হামলার নির্দেশ নয়। সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের হাতেই, এবং তার প্রকাশ্য বক্তব্যে সামরিক পদক্ষেপ ও আলোচনা—দুটি পথই খোলা থাকছে।
বুধবার নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে হামলার যৌথ পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি বিদেশে থাকা মার্কিন কর্মীদের বিরুদ্ধে ইরানের কথিত হুমকি নিয়েও ওয়াশিংটন সতর্ক করেছে।
শুক্রবার জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো একটি গোয়েন্দা স্মারকে বলা হয়েছে, ইরান মার্কিন কর্মীদের লক্ষ্য করার প্রচেষ্টা ‘যথেষ্ট পরিমাণে বাড়িয়েছে’ এবং প্রাণঘাতী ষড়যন্ত্র মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন জায়গায় ‘অগ্রসর পর্যায়ে’ পৌঁছেছে। প্রকাশিত স্মারকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা সম্ভাব্য হামলার সময় উল্লেখ করা হয়নি। এসব সতর্কতার মধ্যে পররাষ্ট্র দপ্তর কয়েকটি আঞ্চলিক দূতাবাসে কর্মীসংখ্যা কমানোর নির্দেশ দিয়েছে।
ট্রাম্প অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছেন। শুক্রবার এক সমাবেশে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ‘আরেকটি ছোট এপিক ফিউরি’ চালাতে পারে—২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সাংকেতিক নাম এটি। শনিবার তিনি সম্ভাব্য হামলার সময় প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান, তবে রোববারের মধ্যেই তা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন।
চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো জুলি নরম্যান আল জাজিরাকে বলেন, এই প্রস্তুতি স্বল্পমেয়াদি অবস্থান প্রদর্শন এবং আগামী মাসের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি সামরিক লক্ষ্য—দুই কাজেই ব্যবহৃত হচ্ছে। তার ভাষায়, ট্রাম্প সবসময় সব বিকল্প খোলা রাখেন; এই পরিকল্পনা একদিকে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক ভঙ্গি, অন্যদিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরের জন্য খুবই বাস্তব একটি বিকল্প।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নভেম্বরের শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় বিমানবাহী রণতরী দল ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট, প্রায় ১০ হাজার অতিরিক্ত সেনা এবং ১৩তম মেরিন অভিযান ইউনিট মোতায়েন করছে।
তেহরান আরও আলোচনার আহ্বানের পাশাপাশি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, নতুন মার্কিন হামলা হলে আরও বিস্তৃত জবাব দেওয়া হবে। শনিবার সম্প্রচারিত বক্তব্যে পেজেশকিয়ান বলেন, তারা আলোচনা করছিলেন, কিন্তু ‘কাপুরুষ’ আমেরিকানরা সবকিছু নষ্ট করে দিয়েছে; তবে চুক্তি সম্পন্ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া উচিত বলেও তিনি যোগ করেন।
রোববার ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণের বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের ওপর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি একটি লুকাস ড্রোন তারা ভূপাতিত করেছে বলে আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে। এ ছাড়া রয়টার্স ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা পুনরায় শুরু হলে উপসাগরে সমুদ্রের নিচের যোগাযোগ কেবলগুলোকে লক্ষ্য করার পরিকল্পনা করেছে তেহরান।
বুধবার ইরান তাদের সামরিক নীতি ‘আক্রমণাত্মক’ ধারায় পরিবর্তনের কথাও ঘোষণা করেছে এবং সতর্ক করেছে, মার্কিন হামলায় ব্যবহৃত ঘাঁটি রয়েছে যেসব দেশে, তারাও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেন, আগে তাদের প্রতিরক্ষা নীতি ছিল প্রতিরক্ষামূলক—কেউ আক্রমণ করলে জবাব দেওয়া হবে; এখন তারা বলছেন, কেউ আক্রমণ করলে তারা জবাবও দেবেন, আক্রমণও চালাবেন।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অক্টোবরই জাহাজের ওপর হামলার দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ মাস হয়ে উঠেছে; এই মাসে এখন পর্যন্ত ১২০টির বেশি হামলার খবর পাওয়া গেছে। সময়টি রাজনৈতিকভাবেও সংবেদনশীল—ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন উত্তেজনা এড়ানোর চাপে আছেন, আর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু মঙ্গলবারের নির্বাচনের আগে জনমতে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় হামলার পক্ষে চাপ দিচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহামাদ এলমাসরি আল জাজিরাকে বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ কূটনৈতিক অগ্রগতির বদলে নতুন সংঘাতের দিকেই ইঙ্গিত করছে। হেগসেথের সাম্প্রতিক ইসরায়েল সফর এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক ও সামরিক স্থাপনা থেকে কর্মী প্রত্যাহারের খবরের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এসব থেকে বোঝা যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শিগগিরই আরেক দফা হামলার পরিকল্পনা করছে, এবং সেই লড়াই আগের দফার চেয়েও বিপজ্জনক ও বিপর্যয়কর হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। নরম্যান যোগ করেন, বড় প্রশ্ন হলো—আরেক দফা উত্তেজনা আগের দফাগুলোর চেয়ে নতুন কী অর্জন করবে এবং কীভাবে তা ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে বাধ্য করবে, তার স্পষ্ট উত্তর এখনো নেই।






