ফাঁস হওয়া ইমেইলে এএফডি নেত্রী ভাইডেলের বদলে যাওয়া অবস্থান: একসময় বহিষ্কার চেয়েছিলেন হ্যোকের, এখন মন্ত্রিসভার জন্য উপযুক্ত বলছেন
জার্মানির কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) নেতৃত্বের ভেতরের পুরোনো দ্বন্দ্ব নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে দলটির বিপুল পরিমাণ অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ফাঁস হওয়ার পর। ফাঁস হওয়া ইমেইলগুলোতে দেখা যাচ্ছে, দলের সহনেত্রী অ্যালিস ভাইডেল প্রায় এক দশক আগে দলের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা বিয়র্ন হ্যোকেকে বর্ণবাদী যুক্তি ও নাৎসি আমলের ভাষা ব্যবহারের জন্য তীব্রভাবে সমালোচনা করেছিলেন এবং তাকে দল থেকে বহিষ্কারের চেষ্টাও করেছিলেন।
অথচ বছর কয়েক পর সেই ভাইডেলই হ্যোকের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন, তাকে দল থেকে বহিষ্কারের উদ্যোগকে ‘মাত্রাতিরিক্ত’ বলেছেন এবং এমনকি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পদের জন্য তাকে উপযুক্ত বলেও মত দিয়েছেন। অতীত ও বর্তমানের এই বিপরীত অবস্থানই এখন জার্মান রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে।
এই তথ্য এসেছে চলতি সপ্তাহে হ্যাকারদের প্রকাশ করা চার লাখ ২০ হাজারের বেশি ইমেইল এবং প্রায় ৪৮ হাজার নথি থেকে। এর মধ্য দিয়ে জার্মানির সবচেয়ে বড় কট্টর ডানপন্থী দলটির ভেতরের জীবনের বিরল এক ঝলক মিলেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
হ্যাকারদের একজন বেনামি মুখপাত্র একটি জার্মান পত্রিকাকে বলেছেন, এই হামলা অন্য কোনো দলকে সমর্থনের অর্থে ‘রাজনৈতিকভাবে’ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না; স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থে জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই তারা কথিত চুরি করা উপাদান প্রকাশ করেছেন।
এএফডি তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি নিশ্চিত করেছে। দলটি জানিয়েছে, গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে হ্যাকাররা একটি হোস্টিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছিল। এই ফাঁসকে দলটি ‘জার্মান দলব্যবস্থার ওপর এবং সেই অর্থে গণতন্ত্রের ওপরই হামলা’ বলে নিন্দা করেছে।
ফাঁস হওয়া উপাদানের মধ্যে ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ভাইডেলের একটি অ্যাকাউন্টের ইমেইলগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে। সে সময় তিনি দলের নেতৃত্বে তুলনামূলক নতুন মুখ ছিলেন এবং ধাপে ধাপে ওপরে উঠছিলেন। তখনকার বার্তাগুলোতে হ্যোকের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগে থাকা একজন রাজনীতিকের ছবিই ফুটে উঠেছে।
২০১৫ সালের অক্টোবরে ভাইডেল সহকর্মীদের সতর্ক করে লিখেছিলেন, ইসলামবিরোধী সড়ক আন্দোলন পেগিডা এবং নব্য-নাৎসি দল এনপিডির (বর্তমানে দ্য হোমল্যান্ড নামে পরিচিত) সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে দলটি মূলধারার রক্ষণশীল ভোটারদের হারাচ্ছে। তার ভাষায়, পশ্চিমে পেগিডার ঘনিষ্ঠতায় এবং পূর্বে এনপিডির ঘনিষ্ঠতায় মূলধারার রক্ষণশীল ভোটারদের তারা পুরোপুরি হারাচ্ছেন।
একই বছর হ্যোকের একটি বক্তৃতা নিয়েও কড়া আপত্তি জানিয়েছিলেন ভাইডেল। ওই বক্তৃতায় হ্যোকে ‘জীবন-সমর্থক আফ্রিকান সম্প্রসারণশীল ধরন’-এর সঙ্গে ‘আত্ম-অস্বীকারকারী ইউরোপীয় স্থানধারক ধরন’-এর তুলনা করেছিলেন। জবাবে ভাইডেল দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী বোর্ডকে লিখেছিলেন, এটি গভীরভাবে সমস্যাজনক, কারণ এখানকার যুক্তি বর্ণভিত্তিক এবং এটি মৌলিকভাবে ভুল।
ভাইডেল আরও সতর্ক করেছিলেন, চরমপন্থীরা ইচ্ছাকৃতভাবে এএফডি ও নব্য-নাৎসি রাজনীতির সীমারেখা মুছে দিচ্ছে, যাতে মূলধারার রক্ষণশীলরা আতঙ্কে দূরে সরে যাচ্ছেন। হ্যোকের বক্তব্য দলটিকে জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারির মুখে ফেলতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা করেছিলেন; বিশেষ করে নাৎসি আমলের ‘ফোল্কসগেমাইনশাফট’ ধারণার ব্যবহারই বার্ষিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দলের নাম ওঠার জন্য যথেষ্ট হতে পারে বলে তিনি লিখেছিলেন।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে দলের যুব সংগঠনের অনুষ্ঠানে দেওয়া হ্যোকের আরেকটি বক্তৃতা বিতর্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। ওই বক্তৃতায় তিনি বার্লিনের হলোকাস্ট স্মৃতিসৌধকে ‘লজ্জার স্মৃতিস্তম্ভ’ বলে আখ্যা দেন, নাৎসি অতীত মোকাবিলায় জার্মানির প্রচেষ্টার সমালোচনা করেন এবং স্মৃতির রাজনীতিতে ‘১৮০ ডিগ্রি মোড়’ নেওয়ার দাবি জানান।
এর জেরে ভাইডেল নিজেই হ্যোকেকে দল থেকে বহিষ্কারের প্রস্তাব আনেন। প্রস্তাবে অভিযোগ করা হয়, হ্যোকে অ্যাডলফ হিটলারের শব্দভান্ডার ব্যবহার করেছেন, সর্বময় নেতৃত্বের নাৎসি মতবাদ ‘ফ্যুরারপ্রিনজিপ’-এর প্রতি সমর্থন দেখিয়েছেন এবং জাতীয় সমাজতন্ত্রের সঙ্গে তার সারগত সখ্য রয়েছে। সহকর্মীদের উদ্দেশে এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় ভাইডেল লিখেছিলেন, ‘একবার অন্তত জেগে উঠুন’, এবং হ্যোকের ভাষার দ্ব্যর্থক অর্থের বিস্ফোরক শক্তি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন।
তবে ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত বদলে যায়। ২০১৭ সালের ফেডারেল নির্বাচনে দলের শীর্ষ প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতির সময় ভাইডেল নেতৃত্ব বৈঠকের কার্যবিবরণীতে নিজের বহিষ্কার প্রস্তাবটি লিপিবদ্ধ করা আটকে দেন; তার যুক্তি ছিল, বাড়তি বিতর্ক দলের ক্ষতি করবে। হ্যোকে পরে স্বীকার করেন তার বক্তৃতাটি ভুল ছিল এবং প্রস্তাব প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। ভাইডেল প্রকাশ্যে তার চিঠিকে ‘ইতিবাচক সংকেত’ বলে স্বাগত জানান এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল শেষ করার আহ্বান জানান।
কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভাইডেল দলের শীর্ষ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন নিশ্চিত করেন। হ্যোকের সঙ্গে যৌথ প্রচারণা চালাবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা একই দলের দুটি অংশ।’ তবু ইমেইলগুলো বলছে, তার ব্যক্তিগত আপত্তি পুরোপুরি মুছে যায়নি; ২০১৭ সালের মে মাসে গর্ভবতী নারীর ছবি ও ‘নতুন জার্মান? আমরা নিজেরাই বানাব’ স্লোগানসংবলিত দলের একটি নির্বাচনী পোস্টারকে তিনি ‘এনপিডির পোস্টার’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
আজ ভাইডেল আর প্রকাশ্যে হ্যোকের সমালোচনা করেন না। থুরিঙ্গিয়ায় তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন তিনি এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পদের জন্যও তার নাম প্রস্তাব করেছেন। ২০২৫ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তাদের সম্পর্ক খুবই ভালো এবং বছরের পর বছর ধরে তারা একে অপরকে চিনেছেন; মন্ত্রিসভার পদের জন্য হ্যোকে উপযুক্ত কি না জানতে চাইলে তার সংক্ষিপ্ত জবাব ছিল, ‘হ্যাঁ।’
অন্যদিকে হ্যোকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের বহিষ্কার প্রক্রিয়াকে ‘পুরোনো খবর’ বলে উড়িয়ে দেন এবং বলেন, তারা একে অপরকে চিনেছেন ও মূল্যায়ন করতে শিখেছেন, ভাইডেলই ছিলেন সঠিক শীর্ষ প্রার্থী এবং তিনি চমৎকার কাজ করেছেন। বর্তমান অবস্থান ও অতীতের সতর্কবার্তার এই তফাত ব্যাখ্যা করতে বলা হলে ভাইডেল মুখপাত্রের মাধ্যমে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন; হ্যোকের মুখপাত্রও শনিবার পাঠানো অনুরোধের জবাব দেননি।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের মে মাসে জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এএফডিকে ‘নিশ্চিত কট্টর ডানপন্থী চরমপন্থী সংগঠন’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছিল, যার অন্যতম ভিত্তি ছিল জার্মান জাতি সম্পর্কে দলটির বর্জনমূলক ধারণা। এই শ্রেণিবিন্যাস কর্তৃপক্ষকে ব্যাপক নজরদারির ক্ষমতা দেয়; তবে গত ফেব্রুয়ারিতে কোলনের একটি আদালত তা সাময়িকভাবে স্থগিত করে। পূর্ব জার্মানির গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচনগুলোর আগে জনমত জরিপে এএফডির বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় এই ফাঁস সেই লিডে চিড় ধরাতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।






