১৫ ঘণ্টা পড়ে থাকার পর গভীর রাতে নিজ গ্রামে দাফন মানিক পশারীর, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা মিলল গোপনে
অবশেষে দাফন সম্পন্ন হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর (৮৭)। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১টার দিকে পুলিশ তাঁর মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসে, আর রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। সকাল ১০টায় মৃত্যুর পর দাফনে বাধার অভিযোগের মুখে প্রায় ১৫ ঘণ্টা পড়ে ছিল তাঁর নিথর দেহ, আর এই সময়জুড়ে মরদেহ নিয়ে চলেছে টানাহেঁচড়া।
মানিক পশারী ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী। সেই পুরোনো মামলার ইতিহাসই তাঁর মৃত্যুর পর শেষকৃত্য ঘিরে নতুন করে উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শনিবার সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জে মৃত্যু হয় মানিক পশারীর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নিজ বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি গোপালগঞ্জে চলে যান। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, এর পর থেকে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাতার বাড়িতে আশ্রয়ে ছিলেন এবং গত দুই মাস ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন।
মৃত্যুর পর দুপুর ১২টার দিকে তাঁর লাশ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নিয়ে আসা হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। সেখানে তাঁকে গার্ড অব অনার দিতে এবং পিরোজপুরে কবর দিতে বাধা দেন জামায়াতের নেতারা — এমনটাই জানা গেছে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর প্রশ্নেই মূল আপত্তি ওঠে।
এরপর বিকেল ৫টার দিকে পুলিশ লাইনসের ভেতরে গোপনে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। স্থানীয় জামায়াত নেতাদের তোপের মুখে পুলিশ এই পথ বেছে নেয় বলে জানা গেছে। কিন্তু এরপরও দাফন নিয়ে আপত্তি ওঠে, ফলে মরদেহ দীর্ঘ সময় পড়ে থাকে এবং দিন পেরিয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত অমীমাংসিত থেকে যায় শেষকৃত্যের প্রশ্নটি।
পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিরোধিতা করেন বলে জানিয়েছেন। তবে দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম জানিয়েছেন, মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসনের বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছে, যদিও তা দিতে হয়েছে পুলিশ লাইনসের ভেতরে, লোকচক্ষুর আড়ালে।
মানিক পশারী পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই নিজ গ্রামেই, নিজ বাড়ির মাটিতেই তাঁকে সমাহিত করা হলো — তবে দিনের আলোতে নয়, গভীর রাতে, মৃত্যুর প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর।
পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম বলেছেন, মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি এবং শান্তিপূর্ণভাবেই দাফন সম্পন্ন হয়েছে। রাতের এই দাফন ঘিরে শেষ পর্যন্ত কোনো সংঘর্ষ বা সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।
একজন মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাপরাধ মামলার বাদীর মরদেহ নিয়ে এমন টানাপোড়েন স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। এক পক্ষের দাবি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে, অন্য পক্ষে প্রশাসনের দেওয়া রাষ্ট্রীয় মর্যাদা — এই দুই বিপরীত অবস্থানের মাঝে পড়ে ১৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে একটি পরিবারকে তাদের স্বজনের শেষকৃত্যের জন্য।
ঘটনাটি আবারও সামনে এনেছে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি ও যুদ্ধাপরাধের বিচার ঘিরে পুরোনো বিতর্কের গভীরতা। সাঈদীর মামলার বাদীর মৃত্যু ও দাফন ঘিরে তৈরি এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দিল, সেই ইতিহাসের ক্ষত স্থানীয় সমাজে এখনো কতটা জীবন্ত।
দাফন সম্পন্ন হওয়ায় আপাতত উত্তেজনার অবসান ঘটলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে — একজন মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা কেন গোপনে দিতে হলো এবং কেনই-বা শেষকৃত্যের জন্য অপেক্ষা করতে হলো গভীর রাত পর্যন্ত। স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক পক্ষগুলোর আগামী দিনের আচরণই বলবে, এই বিতর্ক এখানেই থামছে কি না।


