…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › আইন ও অপরাধ › খবর
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — আবদুল কুদ্দুস, চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ
আইন ও অপরাধ

নদীপথে বাড়ছে হত্যা, ডাকাতি আর চাঁদাবাজি: অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার নৌ পুলিশও, দুই বছরে মামলা প্রায় ছয় হাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক

মাছ ধরতে গিয়ে জলদস্যুদের গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছেন জেলেরা। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করা হচ্ছে নৌশ্রমিকদের। পণ্যবাহী নৌযান থেকে লুট করা হচ্ছে সারসহ মালামাল। নদীপথে ঘটছে অপহরণ, ছিনতাই, মাদক পাচার ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মতো অপরাধও। আর এসব ঠেকাতে অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন নৌ পুলিশের সদস্যরাও।

নৌ পুলিশের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, সন্ধ্যা নামলেই নদীপথে আতঙ্ক বাড়ে। যাত্রীবাহী ট্রলার, জেলেনৌকা, পণ্যবাহী কার্গো, বাল্কহেডসহ বিভিন্ন নৌযানে হামলা ও অপরাধের ঘটনা ঘটছে। তাঁদের মতে, স্থলপথের তুলনায় দীর্ঘ নৌপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি কম থাকায় অপরাধীরা এই পথ বেছে নিচ্ছে। এতে নদীকেন্দ্রিক অপরাধ বাড়ছে।

নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের নদীপথকে ১১টি অঞ্চলে ভাগ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কাজ করছে নৌ পুলিশ। এসব অঞ্চলে হত্যা, অপমৃত্যু, ডাকাতি, ছিনতাই, অস্ত্র, চোরাই পণ্য বহন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত ঘটনায় ২০২৪ সালে ২ হাজার ৮৫টি মামলা হয়। ২০২৫ সালে মামলা হয় ৩ হাজার ৩৯৯টি। এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৩১৪টি।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ, দস্যুতা ও অপমৃত্যুর ঘটনায় হয়েছে আরও ৫০৫টি মামলা। আগের দুই বছরের সব শ্রেণির মামলা এবং চলতি বছরের নয় মাসের এই পাঁচ শ্রেণির মামলা মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯৮৯।

গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে ভোলা সদর উপজেলার পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের কাছে মেঘনা নদীতে মাছ ধরার সময় জলদস্যুদের গুলিতে মো. হোসেন (৩০) নামের এক জেলে নিহত হন। গুলিতে আহত হন আব্বাস (৩২), কাঞ্চন (৩৪) ও সোহেল (২৯) নামের আরও তিন জেলে; তাঁদের সবার বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার বাঘার হাওলা গ্রামে। নৌ পুলিশ জানায়, ওই রাতে জেলেদের ট্রলারে ডাকাতির চেষ্টা করে একদল জলদস্যু; জেলেরা প্রতিহত করতে চাইলে তাঁদের ওপর গুলি চালানো হয়। এ ঘটনায় ওই এলাকার জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মল্লিক বলেন, পাঁচ জেলার সীমানাসংলগ্ন নদীপথে ডাকাত ও জলদস্যুরা জেলেদের নৌকা এবং যাত্রীবাহী নৌযানে হামলা চালায়। সাধারণত সন্ধ্যার পর চাঁদপুরের হাইমচর, শরীয়তপুরের লক্ষ্মীচর ও কাঁচিকাটা, মুন্সিগঞ্জের পদ্মা-মেঘনার মোহনা ও সংলগ্ন চরাঞ্চল, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসংলগ্ন মেঘনা এবং বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জসংলগ্ন মেঘনার চরাঞ্চলে এসব হামলা হয়। জেলেদের হতাহত করে টাকা, মালামাল ও মাছ লুট করা হয়।

শাহ আলম মল্লিক বলেন, এখন পদ্মা-মেঘনায় মা ইলিশ রক্ষায় কোস্টগার্ড, পুলিশ ও মৎস্য বিভাগের দিনরাত অভিযান চলায় তেমন ডাকাতির ঘটনা ঘটছে না। অভিযান শেষে জেলেরা আবার মাছ ধরতে নামলে দুর্গম চরাঞ্চলে রাতে ডাকাতির আশঙ্কা রয়েছে। মৎস্যজীবীদের জানমালের নিরাপত্তায় তখনো কোস্টগার্ড ও পুলিশের টহল জোরদার রাখার দাবি জানান তিনি। তাঁর মতে, জেলার সীমানাসংলগ্ন নদীপথ ও প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে টহল বাড়ালে এসব অপরাধ কমবে।

পণ্যবাহী নৌযানেও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। গত বছরের ১০ অক্টোবর নরসিংদীসংলগ্ন মেঘনা নদীতে একটি বাল্কহেড থেকে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার বস্তা বা ৩১৭ মেট্রিক টন সার ডাকাতি করে দুর্বৃত্তরা। পরে ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে নৌ পুলিশ। এর আগে ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর চাঁদপুরের হাইমচরে মেঘনা নদীতে সারবাহী জাহাজ এমভি আল-বাখেরার সাত কর্মচারীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়; নৌযানে সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড নদীপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে।

বাংলাদেশ বাল্কহেড মালিক সমিতির সহসভাপতি আহমাদুল কবির মোল্লা বলেন, মানিকগঞ্জের হরিরামপুরসংলগ্ন নদীতে পণ্য বোঝাইয়ের সময় প্রতিটি নৌযান থেকে ২ হাজার টাকা, ভোলার ইলিশায় ৫০০ টাকা এবং সাভারের রুস্তমপুর ও আমিনবাজারে আড়াই হাজার টাকা করে টোলের নামে চাঁদা নেওয়া হয়। তাঁর অভিযোগ, এভাবে সারা দেশের নদীর বিভিন্ন স্থানে টোলের নামে নৌযান থেকে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এই চাঁদাবাজি বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান তিনি।

গত বছরের ৭ অক্টোবর সকালে নারায়ণগঞ্জে মেঘনা নদীতে টেঁটা, বল্লম, রামদাসহ দেশি অস্ত্র নিয়ে নৌযান থামিয়ে চাঁদা দাবি করে একটি সংঘবদ্ধ দল। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় এমভি জয়নব বৃষ্টি পরিবহন নামের বাল্কহেডের শ্রমিক মহিবুল্লাহ ও জাকারিয়াকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করা হয়। খবর পেয়ে চালিভাঙ্গা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা অভিযানে গেলে তাঁদের ওপরও টেঁটা ও বল্লম নিয়ে হামলা করে চাঁদাবাজেরা। এতে সহকারী উপপরিদর্শক মাকসুদ এবং কনস্টেবল সোহাগ ও সাইদুর জখম হন। একপর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে রানা ও সাজ্জাদ নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

চাঁদাবাজি ঠেকাতে মামলা ও সাক্ষ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নৌ পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. রেজাউল করিম। তিনি বলেন, নদীতে চাঁদাবাজির অভিযোগ করলেও কেউ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা করেন না। পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলে সাক্ষ্য না থাকায় আদালতে অপরাধ প্রমাণ করা যায় না।

অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করতে গিয়েও হামলার মুখে পড়ছে নৌ পুলিশ। চলতি বছরের ২১ এপ্রিল দিবাগত রাতে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিপুর এলাকাঘেঁষা পদ্মা নদীতে এমন অভিযানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন পাবনার ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুণ্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পাঁচ সদস্য। এ ছাড়া গত ১৯ আগস্ট বিকেলে পিরোজপুরের কাউখালীতে টহল শেষে ফেরার পথে নৌ পুলিশের কনস্টেবল জাকির হোসেনকে ছুরিকাঘাত ও মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে দুর্বৃত্তরা; তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. আরমান হোসেনসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন।

নৌ পুলিশের অঞ্চলভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে চাঁদপুর অঞ্চলে—২০২৪ সালে ৮৫০টি, পরের বছর বেড়ে ২ হাজার ১৭টি। দুই বছরই এরপর ছিল বরিশাল অঞ্চল, সেখানে মামলা ৪৪৮ থেকে বেড়ে হয় ৬১১টি। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ, দস্যুতা ও অপমৃত্যু—এই পাঁচ শ্রেণির মামলায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যা ঢাকা অঞ্চলে, ৮৬টি; এরপর নারায়ণগঞ্জে ৮২টি।

নদীপথের বিশালত্বও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ বাড়িয়ে দিয়েছে। নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুমে দেশের নৌপথের দৈর্ঘ্য সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার; শুষ্ক মৌসুমে তা কমে দাঁড়ায় সাড়ে চার হাজার কিলোমিটারে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার নৌপথে নিয়মিত নৌযান চলাচল করে। দেশের নদীসংলগ্ন এলাকায় নৌ পুলিশের ১২৪টি ফাঁড়ি রয়েছে; এসব ফাঁড়ির সদস্যরা টহল দিয়ে অপরাধীদের তথ্য সংগ্রহ করছেন এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে সফলতা পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন নৌ পুলিশের প্রধান।

তবে নথিভুক্ত পরিসংখ্যানের বাইরেও অপরাধের ঘটনা রয়েছে বলে মনে করেন টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক। তিনি বলেন, নদীপথকেন্দ্রিক অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে; পরিসংখ্যানে যতটা উঠে আসে, বাস্তবে ঘটনা আরও বেশি। তাঁর মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নজরদারি ও তত্ত্বাবধান বাড়াতে জনবল, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি পূরণ করে বাহিনীকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। অপরাধপ্রবণ স্থান শনাক্ত করে অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত অভিযান চালালে পর্যায়ক্রমে নদীপথের অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — জাকির হোসেন, সম্ভাব্য ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী, ৭ নং ওয়ার্ড, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন

আইন ও অপরাধ বিভাগের আরও খবর

আইন ও অপরাধ

মগবাজারে ভোরে আসিফ আকবরের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি, ঘটনার সময় গাড়িতে ছিলেন না শিল্পী

রাজধানীর মগবাজারে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরের ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। শনিবার ভোরে মগবাজারের বিশাল সেন্টারের সামনে …

আইন ও অপরাধ

এক মাসের অভিযানে বদলে গেছে রাতের কুমিল্লা: কিশোর গ্যাংয়ের দাপট কমলেও পৃষ্ঠপোষকদের নিয়ে শঙ্কা কাটেনি

রাত দেড়টায় কুমিল্লা নগরের কান্দিরপাড় এলাকার টাউন হল মাঠের চারপাশে এখন সুনসান নীরবতা। মাসখানেক আগেও এখানে কিশোর-তরুণদের জটলা লেগে থাকত, প্রকাশ্যে বস…

আইন ও অপরাধ

মোবাইল ছিনিয়ে নিতে বাধা দেওয়ায় স্কুলছাত্র অপ্রতিমকে পিটিয়ে হত্যা: চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট

মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতে বাধা দেওয়ায় ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়—তদন্ত শেষে এমন অভিযোগ…

আইন ও অপরাধ

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ১১ জেলায় এক দিনের বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার ৭৮৬, কিশোর গ্যাং অভিযানে আটক ৪৭৪

গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম রেঞ্জের ১১ জেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৭৮৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশ। কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী …