মোবাইল ছিনিয়ে নিতে বাধা দেওয়ায় স্কুলছাত্র অপ্রতিমকে পিটিয়ে হত্যা: চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট
মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতে বাধা দেওয়ায় ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়—তদন্ত শেষে এমন অভিযোগ এনে চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ। গত ২০ অক্টোবর অভিযোগপত্রটি আদালতে জমা দেওয়া হয়।
নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান চার্জশিট দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমাদের কাজ শেষ করে চার্জশিট আদালতে পাঠিয়েছি। এখন বাকি কাজ আদালত করবে।’ অর্থাৎ তদন্তের পর্ব শেষ—এবার বিচারের মঞ্চে উঠতে যাচ্ছে এই মর্মান্তিক হত্যা মামলা।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতে বাধা দেওয়ায় অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সাইফুল ইসলাম তুহিন, মোজাফ্ফর হোসেন ফাহাদ ও কামরুল হাসানকে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সিয়ামের বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকালে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়সংলগ্ন সানন্দা এলাকার একটি নির্জন বনে যায়। সেখানে অপ্রতিমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সে বাধা দেয়। একটি মোবাইল ফোনের জন্য বাধা দেওয়াই কাল হয় এই কিশোরের।
ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তুহিন প্রথমে এবং পরে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে। এতে অপ্রতিমের মৃত্যু হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্জন বনে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ডে সাহায্যের জন্য ছুটে আসার মতো কেউ কাছাকাছি ছিল না।
তদন্তে সূত্র মিলেছিল প্রযুক্তির হাত ধরেই। অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তার সঙ্গে থাকা তুহিনকে শনাক্ত করে পুলিশ। পরে তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফাহাদ ও কামরুলকে আটক করা হয়। এ ছাড়া তুহিনের বাসায় অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়—যে ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। উদ্ধার হওয়া ফোনটি মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল তার মোবাইল ফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। অর্থাৎ হত্যার পরও আসামিদের লক্ষ্য ছিল সেই ফোনটিই।
নিহত অপ্রতিম কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার একজন ব্যবসায়ী এবং মামলার বাদীও তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক মা আর ব্যবসায়ী বাবার একমাত্র সন্তানকে ঘিরেই ছিল পরিবারটির সব স্বপ্ন।
মামলার বাদী ও অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘বৃহস্পতিবার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। ছেলেকে ঘিরেই আমাদের বাঁচার স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন খুনিরা কেড়ে নিয়েছে। খুনিদের দ্রুত বিচার চাই।’
তিনি আরও বলেন, আদালতে দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা হবে, সেই আশা করছি। ‘বয়সের ফাঁককে কাজে লাগিয়ে যেন আসামিরা বেরিয়ে যেতে না পারে’—বাবার এই আশঙ্কা ও দাবিই এখন মামলার সামনের পথের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
চার্জশিট আদালতে গৃহীত হলে শুরু হবে বিচারিক কার্যক্রম। সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন আর আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে মামলাটি এগোবে। একমাত্র সন্তান হারানো পরিবারটির চোখ এখন আদালতের দিকে—দ্রুত বিচার আর সর্বোচ্চ সাজাই তাদের একমাত্র দাবি।






