মাদ্রাসায় শিশু বলাৎকার-ধর্ষণের বিরুদ্ধে আলেম সমাজ সোচ্চার হয় না কেন, প্রশ্ন তুললেন আসিফ নজরুল
মাদ্রাসায় ঘটে যাওয়া শিশু বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে আলেম সমাজের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে শীর্ষ আলেম ও ধর্মীয় বক্তাদের প্রকাশ্যে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দিবাগত রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ নজরুল এসব কথা বলেন। তাঁর পোস্টে ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা ও অভিজ্ঞতার কথা যেমন এসেছে, তেমনি আলেম সমাজের একাংশের নীরবতা নিয়ে তীব্র প্রশ্নও উঠেছে।
পোস্টে তিনি লেখেন, বাংলাদেশের আলেম সমাজে অনেক শ্রদ্ধেয় মানুষ আছেন। হজ করতে গিয়ে, নামাজের সময় কিংবা ইসলামী বয়ান শুনতে গিয়ে তাঁদের কাউকে কাউকে কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। আবার মাওলানা আহমাদুল্লাহর মতো কিছু আলেমের মানবিক কার্যক্রম দেখে মুগ্ধ হয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল অন্য একটি অংশ। তিনি লেখেন, তাঁদের বাইরেও বৃহত্তর আলেম সমাজে বহু মানুষ আছেন, যেমন মাদ্রাসার শিক্ষক। এঁদের কেউ কেউ শিশুদের বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো ভয়াবহ কবিরা গুনাহে লিপ্ত। এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সংখ্যা হয়তো কম, কিন্তু একেবারে নগণ্য নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আসিফ নজরুলের ভাষায়, তাঁরা দিনের পর দিন এমন জঘন্য পাপ করে চলেছেন, যে ধরনের পাপের কারণে আল্লাহ হজরত লুত (আ.)-এর সময়ের জাতিকে কঠোরতম শাস্তি দিয়েছিলেন। এই ধর্মীয় প্রসঙ্গ টেনে তিনি অপরাধটির গুরুত্ব বোঝাতে চেয়েছেন।
তিনি লেখেন, তাঁর খুব অবাক লাগে যে এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে আলেম সমাজের বড় একটি অংশকে কখনও সোচ্চার হতে দেখা যায় না। খাবার, পোশাক, বিনোদন, বাক-স্বাধীনতা—নানা বিষয়ে তাঁরা ফতোয়া দেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পোস্টে তিনি আরও লেখেন, দু-একটি ক্ষেত্রে মব তৈরি করে মানুষকে হত্যা পর্যন্ত করা হয়। অথচ নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘটিত বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো জঘন্যতম অপরাধের বিরুদ্ধে নেতৃস্থানীয় আলেম, জনপ্রিয় ধর্মীয় বক্তা বা হুজুররা কেন সোচ্চার হতে পারেন না—সেই প্রশ্নই তিনি সরাসরি তুলেছেন।
আসিফ নজরুল লেখেন, এ দেশে ইসলামবিরোধী নানা ষড়যন্ত্র রয়েছে। আলেম সমাজকে বুঝতে হবে, মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কারণেই তাঁরা এসব ষড়যন্ত্রের মধ্যেও সম্মানের সঙ্গে টিকে আছেন। কিন্তু বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়ে তাঁদের কেউ কেউ বরং অপরাধীদের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তাঁর সতর্কবার্তা হলো, এটি করলে এসব অপরাধের দায় কোনো না কোনোভাবে তাঁদের ওপরও বর্তাবে। তাঁদের অনেকে ভুল বোঝাবুঝির শিকার হবেন। সামগ্রিকভাবে আলেম সমাজের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা কমে যাবে। এতে বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসাগুলো নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও তিনি মনে করেন।
পোস্টের শেষাংশে তিনি আশা প্রকাশ করে লেখেন, আশা করি অচিরেই আলেম সমাজের নেতৃত্বের ঘুম ভাঙবে। মাদ্রাসায় বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুশাসনের আলোকে কঠোর বক্তব্য তাঁদের কাছ থেকে শোনা যাবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।
তিনি আরও আশা করেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আলেম সমাজ নিজেরাই সোচ্চার হবেন এবং দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাবেন। অর্থাৎ তাঁর আহ্বান শুধু নিন্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান ও কার্যকর ব্যবস্থার দাবি তোলার কথাও তিনি বলেছেন।
একজন সাবেক আইন উপদেষ্টার এই প্রকাশ্য প্রশ্ন মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন ইস্যুতে আলোচনাকে আবার সামনে এনেছে। এখন দেখার বিষয়, তাঁর আহ্বানের পর শীর্ষ আলেম ও ধর্মীয় বক্তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রকাশ্য বক্তব্য বা উদ্যোগ আসে কি না।





