দ্রব্যমূল্য আর আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কারওয়ান বাজারে এনসিপির মাঠের কর্মসূচি: স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানি মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি পালন করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শুক্রবার বিকেলে দলটির উদ্যোগে সপ্তাহব্যাপী এই কর্মসূচিতে শীর্ষ নেতারা অংশ নেন, আর সেখান থেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তোলা হয়।
কর্মসূচিটি ছিল আসন্ন গণবিক্ষোভ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত প্রচার। বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাতে লিফলেট তুলে দিয়ে এনসিপি নেতারা বলার চেষ্টা করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ কতটা চাপে আছে এবং কেন তারা আবার রাজপথে নামছেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, একদিকে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটছে, সন্ত্রাস ও মাদক কারবারিদের ঠেকানো যাচ্ছে না; অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ও বিরোধীদলের ওপর দমনপীড়ন চলছে। তার অভিযোগ, সাংবাদিকদের ওপর দমনপীড়ন সবচেয়ে বেশি চলছে।
নাহিদ ইসলাম উদাহরণ হিসেবে বলেন, নেত্রকোনায় প্রকাশ্যে এক সাংবাদিককে গুলি করা হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকায় ৬০টি যানবাহনে ডাকাতি হয়েছে। তার ভাষায়, এমন পরিস্থিতিতেই বোঝা যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা কতটা গভীর।
দ্রব্যমূল্য প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এতটাই বেড়েছে যে তা মধ্যবিত্তেরও ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। তিনি বলেন, এলপিজি গ্যাসের দাম নির্বাচনের পরও ছিল ১২০০ টাকা; এখন সরকারি হিসাবে তা ১৮০০ টাকা, আর বেসরকারিভাবে বিক্রি হচ্ছে ২৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকা পর্যন্ত। এই সামগ্রিক পরিস্থিতিতে জনগণ নিজেদের খুবই অসহায় বোধ করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সেই বক্তব্য থেকেই আসে তার স্পষ্ট দাবি: সার্বিক ব্যর্থতার দায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। পাশাপাশি তিনি বলেন, এনসিপি জনগণের সঙ্গে আছে।
সংবিধান প্রসঙ্গেও কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে প্রহসন করার জন্য একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি করা হয়েছে; সেই কমিটি বিলুপ্ত করে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণ বন্ধ এবং স্বচ্ছ জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও তোলেন তিনি। প্রস্তাবিত সাইবার আইন সংশোধনী সংসদে পাস হতে দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
একই কর্মসূচিতে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, বিশ্ববাজারে যুদ্ধ পরিস্থিতি কিংবা গ্যাসের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে দেশে দ্রব্যমূল্য বাড়ানো হচ্ছে, তবে বাস্তবে বাংলাদেশের সিন্ডিকেটের কারণেই পণ্যের দাম বেশি বাড়ছে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, গণঅভ্যুত্থানের আগে তারা যেভাবে রাজপথে নেমেছিলেন, এবারও সেভাবেই নেমেছেন। অনেক রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি হাল ছেড়ে দিয়েছেন ভেবে যে এই সরকারকে কিছু করা যাবে না; কিন্তু বিএনপি সরকারকে সবকিছুর জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব, এবং দ্রব্যমূল্যও নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা তুলে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ যখন হাল ছেড়ে দিয়েছিল যে শেখ হাসিনাকে বিদায় করা যাবে না, তখন তারা রাজপথে নেমে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন। তার যুক্তি, মানুষের সামনে অন্যায়-অবিচার নেমে এলে বাংলাদেশের মানুষ তা কখনো সহ্য করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না।
সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কথাও তোলেন এই নেতা। তিনি বলেন, ক্ষমতায় এসে সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দলীয়করণ করা হবে না, সবকিছু মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা হবে এবং জনগণের কল্যাণে রাষ্ট্র গঠন করা হবে; কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি। তার ভাষায়, মানুষ তাদের বলেছে, সরকার মানুষের পেটে লাথি দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের বাজার বাস্তবতা থেকে দূরে থাকার অভিযোগও করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, শীর্ষ নেতা, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কিংবা ভবিষ্যৎ স্থানীয় নির্বাচনের প্রার্থীরা নিজেরা কারওয়ান বাজারসহ কাঁচাবাজারে গিয়ে কেনাকাটা করেন না; তাদের গৃহকর্মীরাই বাজার করেন, ফলে মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষ কতটা কষ্টে আছে তা তাদের স্পর্শ করে না।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, যারা গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, কখনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হননি, তাদের কাছে এক টাকার মূল্য অনেক। বাজারে গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য তাদের নিজেদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই না থাকলে গরিব মানুষের অবস্থা কী হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
কর্মসূচিতে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে দলটির মেয়রপ্রার্থী আসিফ মাহমুদ, দক্ষিণের মেয়রপ্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার দাবি একটাই বলে নেতারা বলেন — মানুষ যেন পেট ভরে খেতে পারে, সুস্থভাবে বাঁচতে পারে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছু ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে।
সপ্তাহব্যাপী লিফলেট কর্মসূচির পর এনসিপির আসন্ন গণবিক্ষোভ কর্মসূচিই এখন এই বিতর্কের পরবর্তী ধাপ। সরকার এই দাবিগুলোর জবাবে কী বলে এবং বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায় কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে এই রাজনৈতিক চাপ কতটা বাড়ে।





