‘মাদার অব অল বম্বস’-এর পাল্টায় ‘ফাদার অব অল বম্বস’ উন্মোচনের ঘোষণা ইরানের, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ বেড়েছে দেড় গুণ
যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাদার অব অল বম্বস’-এর পাল্টা হিসেবে ‘ফাদার অব অল বম্বস’ নামে নতুন একটি অস্ত্র উন্মোচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে ইরানের ইসলামিক রিভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। বুধবার (২১ অক্টোবর) বাহিনীটির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি এই ঘোষণা দিয়েছেন।
ইরানের বার্তা সংস্থা ‘ইয়াং জার্নালিস্টস ক্লাব’-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মোহেব্বি বলেন, ‘আমরা ‘ফাদার অব অল বম্বস’ উন্মোচনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি পর্বে রয়েছি। এটি শত্রুর জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক চমক হতে যাচ্ছে।’ তবে নতুন অস্ত্রটির ধরন বা ধ্বংসক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য তিনি প্রকাশ করেননি।
এই ঘোষণা এল এমন এক সময়ে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্দেশ দিলে ইরানের সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন অস্ত্রাগারের ‘মাদার অব অল বম্বস’ দিয়ে আঘাত হানার পরিকল্পনার খবর প্রকাশিত হয়েছে। গত শুক্রবার এক ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে সেই বোমা ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
‘মাদার অব অল বম্বস’ নামে পরিচিত জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি)-এর ওজন প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কেজি বা ২১ হাজার ৬০০ পাউন্ড। এটি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা অ-পারমাণবিক প্রথাগত বোমাগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় ও শক্তিশালী। ২০১৭ সালের এপ্রিলে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তানে জঙ্গি সংগঠন আইএসের সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে এটি প্রথমবার ব্যবহার করা হয়েছিল।
আইআরজিসি নতুন অস্ত্রের সুনির্দিষ্ট তথ্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই গোপন রেখেছে। তবে এর আগে ২০১৭ সালে আইআরজিসি অ্যারোস্পেস ফোর্স তাদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে ১০ টন ওজনের একটি স্বদেশি প্রথাগত বোমা তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিল। সে সময় দাবি করা হয়েছিল, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ৯ দশমিক ৮ টনের এমওএবি-এর চেয়েও ভারী ও বেশি ধ্বংসক্ষমতাসম্পন্ন হবে এবং ইলিউশিন (আইএল-৭৬) কৌশলগত পরিবহন বিমান থেকে নিক্ষেপ করা যাবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, এবারের ঘোষণাটি মূলত সেই প্রকল্পেরই একটি আধুনিক ও উন্নত সংস্করণের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হতে যাচ্ছে।
একই বিবৃতিতে মোহেব্বি দাবি করেন, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা প্রায় দেড় গুণ বেড়েছে। সুনির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা প্রকাশ না করে তিনি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর গুণগত মানেও অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটেছে — পাল্লা, ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা এবং লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মোহেব্বি জানান, ইরান তার প্রতিরক্ষা নীতি ও সামরিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে, যার মূল লক্ষ্য স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তাঁর ভাষায়, অতীতে ইরানের নীতি ছিল কেবল রক্ষাত্মক — কোনো দেশ আক্রমণ করলে শুধু জবাব দেওয়া হতো। কিন্তু এখন নীতি হচ্ছে, আক্রমণ হলে শুধু জবাব নয়, সরাসরি পাল্টা আক্রমণ শুরু করা হবে।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো হামলার ক্ষেত্রে ইরান সমমানের পদক্ষেপ নেবে এবং দেশটির সামরিক কৌশল দিনে দিনে আরও বেশি ‘অসম যুদ্ধ’-এর ওপর নির্ভরশীল হবে।
এই ঘোষণার পটভূমিতে রয়েছে সাম্প্রতিক সংঘাতের ইতিহাস। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে একযোগে সামরিক অভিযান শুরু করলে জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং আরব অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ধারাবাহিক হামলা চালায়।
পরবর্তীতে জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে সেই শান্তি আলোচনা ভেস্তে যায়।
এমন উত্তেজনার মধ্যে নতুন অস্ত্রের এই ঘোষণা তেহরানের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে অস্ত্রটি আসলে কবে ও কীভাবে উন্মোচন করা হবে, এবং এর প্রকৃত সক্ষমতা কতটা — তা জানতে আরও অপেক্ষা করতে হবে।






