সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছাড়বে না ইরান, ‘ভালো না বাজে’ উপায়ে জয় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মুখে ট্রাম্প
ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটন খুব ভালো অবস্থানে রয়েছে দাবি করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাদের বিজয়ের কৌশল নিয়ে এখন একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আমরা কি ভালো উপায়ে জিততে চাই, নাকি বাজে উপায়ে জিততে চাই?’
ট্রাম্প জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সহায়তা চেয়েছিলেন, তবে তারা কোনো সাহায্য করতে রাজি হননি। ইউরোপের এই অনাগ্রহের কথাও তিনি প্রকাশ্যেই তুলে ধরেছেন।
উত্তর ক্যারোলিনার গ্রিনভিলে এক নির্বাচনী জনসভায় ট্রাম্প দাবি করেন, আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও মার্কিন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করাটাই ইরানের মূল ‘স্বপ্ন’। তবে এই সংঘাত দ্রুতই শেষ হবে—এমন আশ্বাস দিয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে কমে যাবে। বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসবাদী মদদদাতা রাষ্ট্রের হাত থেকে পারমাণবিক অস্ত্র দূরে রাখার জন্য তেলের সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি খুব সামান্য ত্যাগ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে নিজেদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠাতে পরিষ্কারভাবে মানা করে দিয়েছে ইরান। আন্তর্জাতিক প্রস্তাব অনুযায়ী প্রায় ৪০০ কেজি পারমাণবিক উপাদান রাশিয়ার জিম্মায় দেওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।
ঠিক এমন সময়েই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বিরোধ মেটাতে এবং মধ্যস্থতা জোরদার করতে তেহরান সফর করছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। তবে ইরানি কর্মকর্তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, নতুন করে কোনো আলোচনায় বসার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে অতীত আচরণের ভুল শুধরে বিশ্বাস পুনর্গঠন করতে হবে।
ইতিপূর্বে কূটনৈতিক আলোচনার মাঝেই মার্কিন হামলার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ইরানি প্রতিনিধিরা জানান, তাদের পেশ করা সাত দফা প্রস্তাবের বাইরে তারা কোনো ধরনের আপস করবেন না। অর্থাৎ আলোচনার টেবিলে বসলেও নিজেদের শর্ত থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না তেহরান।
হোয়াইট হাউস কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানিয়েছে, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে কোনো সামরিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। কিন্তু হোয়াইট হাউসের এই আশ্বাসের মধ্যেও অঞ্চলে উত্তেজনা কমেনি।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি শক্তিশালী এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন এবং ইসরায়েলে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সফর ওয়াশিংটনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে নানা সংশয় ও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতির মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইরানি সরকারের পতন নিশ্চিত করার গুরুত্ব নিয়ে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ফোনে কথা বলেছেন। নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমরা বর্তমান ইরানি শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটাতে পুরোপুরি বদ্ধপরিকর। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আমি এ বিষয়ে বহুবার আলোচনা করেছি, যার মধ্যে গতকালও আমাদের কথা হয়েছে।’
নেতানিয়াহু আরও বলেছেন, ইরানের সরকারের পতন ঘটলে স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহরও পতন ঘটবে। এর মধ্য দিয়ে লেবাননের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হামলা ও নৌ অবরোধে ইরানের অর্থনীতি এবং সামরিক বাহিনী চাপে পড়েছে বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন। এমনকি ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) নিজেদের সেনাসদস্যদের বেতন দিতে পারছে না এবং আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও অর্থসংকটে পড়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
অন্যদিকে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের আকাশপথের হামলা থেকে সৌদি আরবের শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় রয়্যাল এয়ারফোর্সের (আরএএফ) টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করবে যুক্তরাজ্য।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নির্বাচনকে সামনে রেখে একদিকে কূটনৈতিক মধ্যস্থতা এবং অন্যদিকে সামরিক চাপ ও সরকার পতনের কৌশল—সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এক তীব্র অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে। ট্রাম্পের ‘ভালো না বাজে উপায়’ মন্তব্য সেই অনিশ্চয়তাকে আরও ঘনীভূত করেছে।




