অর্থনীতির মূল চাকা এসএমই: বিশ্বজুড়ে এগিয়ে আসছেন নারী উদ্যোক্তারা, বৈষম্য ঘুচলেই জিডিপিতে ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা
বিশ্ব অর্থনীতিতে শিরোনামে থাকে বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, কিন্তু দেশগুলোর অর্থনীতির মূল চাকা সচল রাখে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা বা এসএমই খাত। বিশ্বব্যাংকের মতে, বিশ্বব্যাপী মোট ব্যবসার প্রায় ৯০ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রকৃতির এবং এগুলো মোট কর্মসংস্থানের অর্ধেকেরও বেশি জোগান দেয়।
এই খাতের গতিপথ এখন অনেকটাই নির্ধারণ করছে নারী উদ্যোক্তাদের ভূমিকা, লিঙ্গভিত্তিক সমতা ও নীতিগত সুরক্ষা। বিশ্বব্যাংকের ‘উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে মাত্র ৬৭ শতাংশ আইনি অধিকার ভোগ করেন এবং আইনি সুরক্ষা কার্যকর করার মতো নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে মাত্র ৪৭ শতাংশ।
গ্লোবাল এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ মনিটরের হিসাবে, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসার মালিকানায় নারী ও পুরুষের অনুপাত গড়ে ০.৬৯। নারী উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক উচ্চ-সম্ভাবনাময় নতুন ব্যবসার প্রায় ৪০ শতাংশ পরিচালনা করেন। ২০২৬ সালের প্রবণতা বলছে, প্রায় ২৫ শতাংশ নারী নতুন ব্যবসা শুরুর পরিকল্পনা করছেন এবং ৫৮ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা হওয়ার কথা বিবেচনা করছেন।
সবচেয়ে বড় হিসাবটি প্রবৃদ্ধি নিয়ে: কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা খাতে লিঙ্গবৈষম্য দূর করা গেলে বিশ্ব জিডিপি ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অর্থাৎ নারীদের পিছিয়ে রাখা শুধু সামাজিক অন্যায় নয়, অর্থনীতির জন্যও বড় ক্ষতি।
যুক্তরাষ্ট্রে চিত্রটি প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের। দেশটির ছোট ব্যবসা প্রশাসনের অফিস অব অ্যাডভোকেসির হিসাবে সেখানে ৩ কোটি ৬০ লাখের বেশি ছোট ব্যবসা রয়েছে, যার মধ্যে নারীরা ১ কোটি ৫৭ লাখের বেশি ব্যবসা পরিচালনা করেন — মোট ফার্মের প্রায় ৪০ থেকে ৪০.৬ শতাংশ। তবে এর বড় অংশ, প্রায় ৯০ শতাংশ, একক উদ্যোক্তানির্ভর হওয়ায় নারী মালিকানাধীন ফার্মের গড় বার্ষিক আয় পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। সরকারি ডব্লিউওএসবি ফেডারেল কন্ট্রাক্ট প্রোগ্রাম নারীদের সরকারি ক্রয়ে অন্তত ৫ শতাংশ অংশ নিশ্চিত করে সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করেছে।
কানাডা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অত্যন্ত কাঠামোবদ্ধ একটি দেশ। দেশটির উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ স্ট্র্যাটেজির আওতায় হাজার হাজার নারী উদ্যোক্তাকে ঋণ ও অনুদান দেওয়া হয়েছে এবং ২০২৬ সালে এই তহবিলে অতিরিক্ত ১৭ কোটি ৩৭ লাখ কানাডিয়ান ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে, যা নারী নেতৃত্বাধীন ক্ষুদ্র ব্যবসার বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে।
ইউরোপেও এসএমই-ই প্রাণ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৯৯ শতাংশ ব্যবসা এসএমই, যা দুই-তৃতীয়াংশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। যুক্তরাজ্যের বেসরকারি খাতের প্রায় ৯৯.৮ শতাংশ ব্যবসা এসএমই এবং এগুলো প্রায় ৬১ শতাংশ কর্মসংস্থান দেয়। যুক্তরাজ্যের ইনভেস্টিং ইন উইমেন কোডের ৩০০-র বেশি স্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠান নারী নেতৃত্বাধীন কোম্পানিতে বাজারের তুলনায় বেশি বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছে। জেন্ডার সমতায় শীর্ষে থাকা ফিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ড টেকসই ও বৈশ্বিকমুখী স্টার্টআপ তৈরিতে এগিয়ে।
এশিয়ায় ছোট ব্যবসার ওপর নির্ভরতা আরও বেশি, তবে চ্যালেঞ্জও ভিন্ন। ইন্দোনেশিয়ায় এসএমই দেশটির মোট কর্মসংস্থানের ৯৭ শতাংশ এবং জিডিপির ৬১ শতাংশ অবদান রাখে। ভারতে নিবন্ধিত এমএসএমই খাতের প্রায় ৩৮ শতাংশ বা প্রায় ৩ কোটি ৬৯ লাখ ব্যবসার মালিক নারীরা; দেশটির ছোট ব্যবসাগুলো প্রায় ৬২ শতাংশ কর্মসংস্থান তৈরি করলেও উৎপাদনে তাদের অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ।
বাংলাদেশের এসএমই খাতেও নারী উদ্যোক্তারা অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ও এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, কম সুদের ঋণ ও জামানতবিহীন অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিজিটাল সাক্ষরতা, সহজ শর্তে ঋণ ও বাজার সংযোগ বাড়াতে পারলেই এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে। শুধু ঋণ দিলেই হবে না, পণ্য বিক্রির বাজার ও প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতাও নারী উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
বিশ্বের চালচিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় উন্নত আইনি কাঠামো ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সহজলভ্যতায় নারীরা প্রযুক্তিনির্ভর ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির স্টার্টআপে এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে এশিয়া ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কুটিরশিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বুটিকের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসা গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখছে।
উপসংহারে বলা যায়, যেখানে নারীরা আইনি নিরাপত্তা, জামানতবিহীন ঋণ ও উন্নত বাজার ব্যবস্থার সুযোগ পান, সেখানেই ছোট ব্যবসা দেশের অর্থনীতিকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয় — এই শিক্ষা বাংলাদেশের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।




