পিএইচপির ভয়াবহ ত্রুটিতে ইউরোপজুড়ে বন্ধ সরকারি ওয়েবসাইট, জরুরি হালনাগাদের তাগিদ
ইন্টারনেটের অসংখ্য ওয়েবসাইটের ভিত্তি হিসেবে কাজ করা পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষায় দুটি ভয়াবহ নিরাপত্তা ত্রুটি ধরা পড়ায় ইউরোপজুড়ে সরকারি ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়ার হিড়িক পড়েছে। বুধবার বিকেলে ত্রুটি দুটির সমাধান বা ফিক্স প্রকাশ করা হয়েছে।
ফিনল্যান্ড সরকারের জনসেবার ওয়েবসাইটগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা নিজেদের ওয়েবসাইটই অফলাইন করে দিয়েছে। একই পথে হেঁটেছে দেশটির জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশবিষয়ক জাতীয় প্রতিষ্ঠান; নেদারল্যান্ডসের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ টুইডে কামেরের ওয়েবসাইটও এখন অপ্রাপ্য।
যুক্তরাজ্যের এডিনবরা কাউন্সিলের ওয়েবসাইটও অপ্রাপ্য হয়ে পড়েছে। বিবিসির ডক্টর হু ও দ্য ট্রেইটরসসহ কয়েকটি অনুষ্ঠানের ওয়েব পেজও বন্ধ রয়েছে, যদিও সেগুলোর সঙ্গে পিএইচপি ত্রুটির সম্পর্ক বিবিসি নিশ্চিত করেনি।
ত্রুটি দুটি আবিষ্কার করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজ বলেছে, এগুলো এআই প্রযুক্তির আবিষ্কৃত ‘সবচেয়ে গুরুতর দুর্বলতা’। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফ ও উইজের গবেষকেরা ওপেনএআইয়ের অত্যাধুনিক এআই ব্যবহার করে ত্রুটি দুটি খুঁজে পেয়েছেন।
ওপেনএআই নিজেদের ব্লগ পোস্টে একে ‘সাম্প্রতিক স্মৃতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী নিরাপত্তা সমস্যাগুলোর একটি’ বলে বর্ণনা করেছে। গবেষকদের ভাষ্য, ত্রুটি দুটি এক দশকের বেশি সময় ধরে অজ্ঞাত ছিল।
উইজের হিসাব, ইন্টারনেটের প্রায় ৭০ শতাংশই এই ত্রুটিতে আক্রান্ত হতে পারে—যদিও বিবিসি এই হিসাব যাচাই করতে পারেনি। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, মার্কিন ফেডারেল সংস্থাগুলো সরকারি ব্যবস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে এর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন করছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সামাজিক মাধ্যমে মানুষকে নিজেদের ওয়েবসাইট পিএইচপিতে চলে কি না, তা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি সেন্টার (এনসিএসসি) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অস্ট্রেলিয়ার সমমানের সংস্থাগুলো পিএইচপি ব্যবহারকারীদের দ্রুত ফিক্স প্রয়োগের তাগিদ দিয়েছে। এনসিএসসি বলেছে, ‘তাৎক্ষণিক প্রতিকার সম্ভব না হলে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত না করা পর্যন্ত সিস্টেম অফলাইন রাখার কথা বিবেচনা করা উচিত।’
ইইউর কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (সিইআরটি-ইইউ) জানিয়েছে, ত্রুটি দুটির ঝুঁকির মাত্রা এমন যে, তা দিয়ে পরিচয় যাচাই ছাড়াই দূর থেকে কোড চালানো (রিমোট কোড এক্সিকিউশন) সম্ভব হতে পারে—অর্থাৎ হ্যাকার দূর থেকেই সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হান্ট্রেসের ভাষ্য, ‘পিএইচপি সর্বত্র। ওয়ার্ডপ্রেস, দ্রুপাল, জুমলা ও ম্যাজেন্টো সাইট, শেয়ার্ড হোস্টিং প্ল্যাটফর্ম ও কন্ট্রোল প্যানেলের পেছনে নীরবে কাজ করে এটি—এমন অনেক সফটওয়্যারের ভেতরেও, যারা পিএইচপি ব্যবহারের কথা ঘোষণাই করে না।’
সোফোস কাউন্টার থ্রেট ইউনিটের বিশেষজ্ঞ ডন স্মিথ বিবিসিকে বলেছেন, এটি হ্যাকারদের কাছে ‘সম্ভবত অগ্রাধিকার পাওয়া লক্ষ্য’ হয়ে উঠবে। তাঁর মতে, আসল চ্যালেঞ্জ শুধু প্যাচ বসানো নয়; কোন কোন জায়গায় পিএইচপি চলছে, তার প্রতিটির হদিস বের করা ও ব্যবস্থাপনা।
স্মিথ আরও বলেন, হামলাকারী ইতিমধ্যে কোনো সিস্টেমে ঢুকে পড়েছে কি না, তার লক্ষণ খুঁজে দেখাটাও জরুরি—কারণ ত্রুটি দুটি দীর্ঘদিন অজ্ঞাত থাকায় সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আগামী কয়েক দিনে বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইট পরিচালনাকারীদের মূল কাজ হবে নিজেদের ব্যবস্থায় পিএইচপির সব সংস্করণ খুঁজে বের করে হালনাগাদ করা; ততদিন পর্যন্ত অনেক সাইটের সাময়িক বন্ধ থাকা অব্যাহত থাকতে পারে।



