উত্তর সাগরের জ্যাকড গ্যাসক্ষেত্রে চূড়ান্ত অনুমোদন দিল ব্রিটেন, জলবায়ুকর্মীদের তীব্র ক্ষোভ
ব্রিটেন সরকার উত্তর সাগরের বিতর্কিত জ্যাকড গ্যাসক্ষেত্রে খননের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। সরকারের যুক্তি, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া পরিস্থিতিতে এই প্রকল্প দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করবে। বুধবারের এই সিদ্ধান্তে ক্ষেত্রটির ভবিষ্যৎ নিয়ে মাসের পর মাস ধরে চলা অনিশ্চয়তার অবসান হলো; আদালতের এক রায়ের পর উন্নয়নকারীদের নতুন করে অনুমোদনের আবেদন করতে হয়েছিল।
জ্যাকড ক্ষেত্রটি স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিন থেকে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার (১৫০ মাইল) পূর্বে উত্তর সাগরে অবস্থিত। মন্ত্রীরা বলছেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এখান থেকে ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ব্রিটিশ জলসীমায় জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন বাড়াতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে ছিলেন।
বার্নহ্যাম বলেছেন, এই ক্ষেত্র শত শত কর্মসংস্থান রক্ষা করবে এবং এই শীতে লাখ লাখ ঘর উষ্ণ রাখতে সাহায্য করবে। তাঁর ভাষায়, 'মানুষ যখন সত্যিই সংকটে, তখন দায়িত্বশীলভাবে আমাদের বিদ্যমান জ্বালানি মজুদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের দিকে তাকানোই সঠিক। আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যেতে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে নেট জিরো অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু আমাদের উচ্চাভিলাষী জলবায়ু পথে থাকলেও আগামী কয়েক দশক ধরে জ্বালানি চাহিদার অংশ হিসেবে তেল ও গ্যাসের প্রয়োজন হবে। এ কারণেই আমরা উত্তর সাগর নিয়ে বাস্তববাদী পন্থা নিচ্ছি।'
এই সিদ্ধান্ত ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন আবারও প্রকাশ করেছে—একদিকে জলবায়ু প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে ঘরোয়া সরবরাহ বাড়িয়ে পরিবারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টিকারী জ্বালানি বিল কমানোর দাবি। ২০২৪ সালে তৎকালীন নেতা কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বে লেবার ক্ষমতায় ফিরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁকার অংশ হিসেবে নতুন তেল-গ্যাস লাইসেন্স না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। প্রকল্পের সমর্থকরা বলছেন, জ্যাকড সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে না, কারণ ক্ষেত্রটিতে অবকাঠামো আগেই স্থাপিত হয়েছে এবং এটি প্রথম অনুমোদন পেয়েছিল আগের কনজারভেটিভ সরকারের আমলে—শেটল্যান্ডের পশ্চিমে রোজব্যাংক তেলক্ষেত্রের মতোই। পরে দুটি অনুমোদনই আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
গত বছরের শুরুতে স্কটল্যান্ডের একটি আদালত রায় দেন, উত্তোলিত জ্বালানি শেষ পর্যন্ত পোড়ালে যে নির্গমন হবে, তা অনুমোদনের সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। সেই রায়ের কারণেই দুটি প্রকল্পকেই নতুন করে আবেদন করতে হয়।
ব্রিটেন সরকারের হিসাব অনুযায়ী, জ্যাকড ক্ষেত্র ১১ বছর ধরে চলবে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৬ শতাংশ বাড়াবে এবং অর্থনীতিতে আনুমানিক ২৯০ কোটি পাউন্ড (৩৩০ কোটি ইউরো) যোগ করবে। ক্ষেত্রটি পরিচালনা করে শেল ও নরওয়ের ইকুইনরের যৌথ উদ্যোগ আদুরা; প্রতিষ্ঠানটি রয়টার্সকে জানিয়েছে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে জ্যাকড থেকে দিনে ৪০ হাজার ব্যারেল তেলের সমপরিমাণ গ্যাস উৎপাদিত হবে।
তবে বিরোধীদের হিসাব ভিন্ন। গ্রিন পার্টি জ্বালানি সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে যুক্তি দিয়েছে, প্রকল্পের নির্মাণকাজের বড় অংশ ইতোমধ্যে নরওয়েতে সম্পন্ন হয়েছে এবং এটি ব্রিটেনে মাত্র ২৭টি প্রত্যক্ষ পূর্ণকালীন কর্মসংস্থান তৈরি করবে। বাম ঘরানার সমালোচকদের ক্ষোভ প্রশমনে সরকার একটি নতুন সম্পদ তহবিলের ঘোষণাও দিয়েছে, যার মাধ্যমে তেল-গ্যাস থেকে পাওয়া রাজস্ব সবুজ রূপান্তরে ব্যয় করা হবে।
তাতেও সন্তুষ্ট নন বিরোধীরা। তাদের যুক্তি, তেল-গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে নির্ধারিত হয় বলে ভোক্তাদের বিলে কোনো পরিবর্তন আসবে না। গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কি এই সিদ্ধান্তকে 'জলবায়ু ধ্বংসযজ্ঞ' বলে নিন্দা করেছেন। গ্রিনপিস বলেছে, এই অনুমোদন প্রমাণ করে জ্বালানি নীতির ওপর জীবাশ্ম জ্বালানির লবিস্টদের 'বিষাক্ত প্রভাব' এখনো রয়ে গেছে। গ্রিনপিস যুক্তরাজ্যের রাজনীতিবিষয়ক প্রধান অ্যামি ম্যাকার্থি বলেছেন, 'প্রকৃত বাস্তববাদ মানে হলো ব্যয়বহুল তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরতা ছিন্ন করা, যা ব্রিটিশ পরিবারগুলোকে দেউলিয়া করছে, চরম আবহাওয়াকে তীব্র করছে এবং আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে পেট্রোরাষ্ট্রগুলোর দয়ার ওপর ছেড়ে দিচ্ছে।'
শিল্পখাতের কণ্ঠগুলো অবশ্য বিপরীত অবস্থানে। ফিউচার এনার্জি নেটওয়ার্কসের প্রধান নির্বাহী জেমস আর্ল সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, 'বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার এই সময়ে দেশে উৎপাদিত গ্যাস ব্রিটেনের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করে।' ইউনাইট ইউনিয়নের নেতা শ্যারন গ্রাহাম বলেছেন, এই অনুমোদন নবায়নযোগ্য খাতে সমমানের কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি ও অর্থায়নের জন্য 'আরও কিছুটা সময়' দেবে।
ইউনিয়ন ও শিল্পমহল সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও পরিবেশবাদী প্রচারকদের মতে, এই অনুমোদন নির্গমন আরও বাড়াবে এবং পরিবারগুলোর বিল কমাতে কোনো ভূমিকাই রাখবে না—বিতর্কের দুই প্রান্তের এই অবস্থান থেকেই বোঝা যায়, সিদ্ধান্তটি কতটা বিভাজনমূলক।
এখন সবার নজর রোজব্যাংক ক্ষেত্রের দিকে। আদুরা মন্ত্রীদের আহ্বান জানিয়েছে স্কটল্যান্ডের উত্তর উপকূলের সেই ক্ষেত্রটিও অনুমোদন দিতে। তবে জ্বালানি মন্ত্রী মিয়াত্তা ফানবুলেহ বলেছেন, ওই ক্ষেত্র নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে 'আরও কিছুটা সময়' লাগবে। জ্যাকডের উৎপাদন শুরু হলে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিল নিয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হয়, তা-ই এখন দেখার বিষয়।



