চেক কারাগারে ছয় মাস আটক ফিলিস্তিনপন্থী কর্মী মুরসি: ‘ওরা আমাদের ভেঙে ফেলতে চায়’
চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে ফিলিস্তিনপন্থী কর্মী ইউসুফ মুরসির বিচার-পূর্ব আটক ছয় মাসে গড়িয়েছে। ২৫ বছর বয়সী এই মিসরীয় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, গত মার্চে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ থাকা একটি চেক অস্ত্র কারখানায় অগ্নিসংযোগের হামলায় তিনি জড়িত ছিলেন। মুরসি অবশ্য এই অভিযোগে নিজের কোনো সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন।
মুরসি চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী। তিনি সেই ১১ জনের একজন, যাদের বিরুদ্ধে ওই হামলার ঘটনায় ‘সন্ত্রাসবাদের’ অভিযোগ আনা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
মুরসির ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার দুই দিন পর সশস্ত্র ও মুখোশ পরা পুলিশ সদস্যরা তার সামনের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। আটকের প্রথম তিন মাস তিনি নির্জন কারাবাসে ছিলেন বলে তার আইনজীবী জানিয়েছেন। এখন তিনি দিনে এক ঘণ্টা সেলের বাইরে থাকতে পারেন, দিনে ২০ মিনিট ফোনে কথা বলতে পারেন, আর প্রতি দুই সপ্তাহে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারেন।
এক বিবৃতিতে মুরসি বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালানো হচ্ছে — মাসের পর মাস নির্জন কারাবাসে রেখে, সাক্ষাৎ বন্ধ করে, চিঠিপত্র আটকে আর ভয় ছড়িয়ে তাদের ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরাসরি প্রমাণ ছাড়া, মূলত ঝোঁক, সক্রিয়তা আর বর্ণবাদের মিশেলে মানুষকে হেফাজতে রেখে তা বারবার দীর্ঘায়িত করা অগ্রহণযোগ্য বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
মুরসি ও তার আইনজীবী পাভেল চিজিনস্কি মনে করেন, প্রাগে ফিলিস্তিনপন্থী সক্রিয়তায় জড়িত থাকার কারণেই তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। আইনজীবীর ভাষ্য, পুলিশের হাতে থাকা প্রমাণের একটি হলো — আগুন লাগার পরদিন মুরসি সামাজিক মাধ্যমে ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীদের জন্য পরামর্শ পোস্ট করেছিলেন, পুলিশের মুখোমুখি হলে কী করতে হবে সে বিষয়ে। চিজিনস্কি এই যুক্তিকে ‘হাস্যকর’ বলেছেন; তার মতে, গুগলে খুঁজলেই প্রথম পরামর্শ আসে আইনজীবীর জন্য অপেক্ষা করতে — কিন্তু একই কথা ফিলিস্তিনপন্থী কর্মী হয়ে বন্ধুদের লিখলেই তা অপরাধের প্রমাণ হয়ে যায়।
চিজিনস্কি আরও জানান, তদন্তের শুরুতে এই মামলা না নিতে কর্তৃপক্ষের চাপের মুখে পড়েছিলেন তিনি, ফলে মুরসির বাসায় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশির সময় তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি। তার ভাষ্য, এই তদন্তে পুলিশের অসাধারণ মনোযোগ আর বিশাল সম্পদের প্রমাণ স্পষ্ট, কিন্তু মুরসি ইতিমধ্যে পাঁচ মাস কারাগারে থাকাটা অবশ্যই আইনের লঙ্ঘন।
চেক আইনে, দোষী সাব্যস্ত হননি এমন বিচার-পূর্ব আটক ব্যক্তির আটকাদেশ প্রতি তিন মাসে আদালতকে পর্যালোচনা করতে হয়। মুরসির আটকাদেশ এ পর্যন্ত দুবার পর্যালোচনা হয়েছে এবং প্রতিবারই আদালত তাকে কারাগারেই রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। ডিসেম্বরের শুরুতে আবার পর্যালোচনা হবে, আর বিচার শুরু হতে পারে এক বছরের মধ্যে। আইনজীবীদের মতে, চেক প্রজাতন্ত্রে আটক ব্যক্তিরা দোষী সাব্যস্ত না হয়েও সর্বোচ্চ চার বছর পর্যন্ত কারাগারে থাকতে পারেন।
আগুনের ঘটনাটি ঘটে গত ২০ মার্চ ভোরে, প্রাগ থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার পূর্বে পারদুবিচে শহরে এলপিপি হোল্ডিংয়ের একটি অস্ত্র কারখানায়। এতে কেউ আহত হননি, তবে ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ কোটি ক্রাউন, অর্থাৎ অন্তত ৪০ লাখ ইউরো বলে পুলিশ জানিয়েছে।
‘দ্য আর্থকোয়েক ফ্যাকশন’ নামে আগে অপরিচিত একটি ফিলিস্তিনপন্থী গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করে আগুনের ভিডিও পোস্ট করে। গোষ্ঠীটির দাবি, ইসরায়েলি অস্ত্র প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসের সঙ্গে সহযোগিতার কারণে এলপিপিকে লক্ষ্য করা হয়েছে। ২০২৩ সালে এলপিপি ও এলবিট চেক প্রজাতন্ত্রে ড্রোন তৈরির অংশীদারত্বের ঘোষণা দিয়েছিল, তবে আগুনের দিন এলপিপির এক মুখপাত্র চেক গণমাধ্যমকে বলেন, সেই সহযোগিতা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি।
হামলার পরের সপ্তাহগুলোতে পুলিশ ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়ে ইউক্রেনীয়, চেক, স্লোভাক, পোলিশ ও আমেরিকান নাগরিকসহ কয়েকজন বিদেশিকে গ্রেপ্তার করে। মুরসি ছাড়া বাকি ১০ অভিযুক্তের মধ্যে তিনজন পোল্যান্ডে গৃহবন্দী এবং সাতজন চেক প্রজাতন্ত্রে কারাগারে রয়েছেন।
এই মামলার প্রতিধ্বনি ইউরোপের অন্য দেশেও শোনা যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের কর্মীদের সন্ত্রাসবাদ আইনে সাজা দেওয়া হয়েছে, আর জার্মানিতে এলবিট সিস্টেমসের সঙ্গে যুক্ত একটি স্থাপনা লক্ষ্য করার অভিযোগে পাঁচজনের বিচার চলছে। গত দুই বছরে এলবিট সিস্টেমস ইউরোপজুড়ে ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীদের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।
প্রাগে ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীদের পরিবেশও ক্রমে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। অগ্নিসংযোগের পরের মাসগুলোতে কয়েক ডজন সদস্যের বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্ত শুরু হওয়ার পর ‘প্রাগ ফর প্যালেস্টাইন ইয়ুথ’ নামের একটি সংগঠন বিক্ষোভ ও দাতব্য অনুষ্ঠান আয়োজন বন্ধ করে দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২৫ বছর বয়সী চেক কর্মী ‘রু’ জানান, আটক ব্যক্তিদের বন্ধু ও সহকর্মীরা জিজ্ঞাসাবাদ, বাসায় তল্লাশি আর অনির্দিষ্টকালের জন্য যন্ত্রপাতি জব্দের মুখে পড়ছেন।
আগুনের নয় দিন পর জিজ্ঞাসাবাদের পর রু-কে বাসায় নিয়ে তল্লাশি চালানো হয়, ২৪ ঘণ্টার বেশি তাকে জাগিয়ে রাখা হয় এবং এরপর এক সপ্তাহ ধরে তার প্যানিক অ্যাটাক হয় বলে তিনি জানান। পরে তাকে বলা হয়, তিনি এই মামলার একজন সাক্ষী; তার ফোন ও কম্পিউটার জব্দ করা হয়েছে, যা এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি। পুলিশ নিশ্চিত করেছে, বিভিন্ন জাতীয়তার সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করে অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তাদের হেফাজতে রাখা হয়েছে; তদন্ত চলমান থাকায় তত্ত্বাবধানকারী প্রসিকিউটর দপ্তরই তথ্য প্রকাশের একমাত্র কর্তৃপক্ষ বলেও জানিয়েছে পুলিশ।


