দক্ষিণ আমেরিকায় তিন মাসে ১৯ কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি, ব্রাজিল-চিলি-পেরুই প্রধান গন্তব্য
প্রচলিত বাজারের বাইরে নতুন গন্তব্য খোঁজার চেষ্টায় দক্ষিণ আমেরিকায় বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, এই অঞ্চলের ১১টি দেশে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ১৯ কোটি ৫১ লাখ ৭০ হাজার ডলারের পণ্য। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ইপিবির হিসাব বলছে, এই সময়ে ব্রাজিল, চিলি ও পেরু উঠে এসেছে বাংলাদেশের প্রধান গন্তব্য হিসেবে।
দেশভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে এগিয়ে ব্রাজিল। তিন মাসে সেখানে গেছে ৭ কোটি ৮ লাখ ২০ হাজার ডলারের পণ্য। এরপর চিলিতে রপ্তানি হয়েছে ৫ কোটি ১৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার এবং পেরুতে ২ কোটি ৪২ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এ ছাড়া কলম্বিয়ায় ১ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার, উরুগুয়েতে ১ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার এবং আর্জেন্টিনায় ১ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার ডলারের পণ্য পাঠিয়েছে বাংলাদেশ।
ব্রাজিল ও চিলি মিলেই দক্ষিণ আমেরিকায় বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬২ দশমিক ৯ শতাংশ জোগান দিয়েছে; দুই দেশে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার। ফলে অঞ্চলটিতে বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় এই দুই দেশ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি পেরু ও কলম্বিয়ায় ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়িয়ে নতুন ক্রেতা তৈরির সুযোগও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে ছবিটির অন্য দিক হলো পোশাকের ওপর গভীর নির্ভরতা। ইপিবির পণ্যভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ১১টি দেশে রপ্তানি এখনো মূলত তৈরি পোশাকনির্ভর। প্রথম তিন মাসে ওভেন পোশাক ও পোশাকের আনুষঙ্গিক পণ্য থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৪৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার, আর নিট পোশাক থেকে এসেছে প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ ডলার। দুই শ্রেণি মিলিয়ে আয় প্রায় ১৫ কোটি ৫৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭৯ দশমিক ২ শতাংশ।
পোশাকের বাইরে অন্য পণ্যের অংশ এখনো ছোট। একই সময়ে ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ ৮০ হাজার ডলার এবং জুতা ও সংশ্লিষ্ট পণ্য থেকে প্রায় ৫৭ লাখ ১০ হাজার ডলার। রপ্তানি তালিকায় অন্যান্য বস্ত্রপণ্য, চামড়াজাত সামগ্রী ও ভ্রমণসামগ্রীও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব পণ্যের বাজার বড় করা গেলে দক্ষিণ আমেরিকায় বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িতে বৈচিত্র্য আসবে।
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার প্রচলিত বাজারের বাইরে দক্ষিণ আমেরিকায় সম্প্রসারণের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তৈরি পোশাক প্রধান উৎস হলেও পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত সামগ্রী, গৃহসজ্জার উপকরণ, হস্তশিল্প এবং জীবনযাপন-সংশ্লিষ্ট পণ্যের চাহিদা চিহ্নিত করে নতুন ক্রেতা তৈরি করা গেলে নতুন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে।
সেই লক্ষ্য সামনে রেখে গত ১১ থেকে ১৩ আগস্ট ব্রাজিলের সাও পাওলোতে অনুষ্ঠিত হোম শো ব্রাজিল ২০২৬ প্রদর্শনীতে অংশ নেয় বাংলাদেশ। ইপিবির আর্থিক সহায়তায় এবং ব্রাসিলিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে দেশের চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়: জিহান প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ, মাদার ট্যানারি, রেইনবো জুট ও ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টস। পাঁচটি বুথের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের পণ্য তুলে ধরে।
প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের পাটজাত পণ্য, ব্যাগ, চামড়াজাত সামগ্রী, প্রাকৃতিক তন্তুর ঝুড়ি, গৃহসজ্জার উপকরণ, বাঁশের পণ্য, টেরাকোটা, মাটির সামগ্রী ও নকশিকাঁথা স্থান পায়। বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্য ও সম্ভাবনাময় শিল্প সম্পর্কে বিদেশি ক্রেতাদের ধারণা দিতে ইপিবি ও দূতাবাসের পক্ষ থেকে একটি প্রচারমূলক বুথও রাখা হয়।
প্রদর্শনী চলাকালে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়। সম্ভাব্য ক্রেতারা বাংলাদেশের স্টল ঘুরে প্রদর্শিত পণ্যের প্রতি আগ্রহ দেখান। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের গৃহসজ্জা ও জীবনযাপন-সংশ্লিষ্ট পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়ে একটি সেমিনারও আয়োজন করা হয়, যেখানে ব্রাজিলের ব্যবসায়ী সংগঠন ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পণ্যের বৈচিত্র্য তুলে ধরা হয়।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসকে বলেছেন, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা এবং উদীয়মান আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে ইপিবি কাজ করছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় আরও পরিকল্পিত ও পেশাদারভাবে অংশ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেছেন, তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং অল্প কয়েকটি বাজারে রপ্তানি সীমাবদ্ধ থাকলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় দেশের রপ্তানি আয় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এ কারণে নতুন পণ্য ও নতুন বাজার খুঁজে বের করা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
মোহাম্মদ হাসান আরিফের মতে, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বাজারের চাহিদা, ভোক্তার পছন্দ, পণ্যের দাম, প্রতিযোগিতা এবং ব্যবসায়িক রীতিনীতি সম্পর্কে আগাম গবেষণা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জাতীয় প্যাভিলিয়নের ব্র্যান্ডিং জোরদার, রপ্তানিকারকদের প্রস্তুতি উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সুযোগে রূপ নিতে পারে।
সব মিলিয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় তিন মাসে ১৯ কোটি ডলারের বেশি রপ্তানি নতুন বাজারে বাংলাদেশের পায়ের ছাপের প্রমাণ দিচ্ছে। তবে আয়ের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগের বেশি এখনো পোশাক থেকে আসায়, আগামী দিনের মূল চ্যালেঞ্জ পণ্য বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং ব্রাজিল-চিলির বাইরে বাকি দেশগুলোতেও ক্রেতা বাড়ানো।




