বণিক জাহাজে রুশ হামলা বাড়ায় কৃষ্ণ সাগরে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে ন্যাটো
বণিক জাহাজে রাশিয়ার মারাত্মক হামলা বেড়ে যাওয়ায় কৃষ্ণ সাগরে অতিরিক্ত সামরিক সরঞ্জাম ও জনবল মোতায়েন করছে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো। মঙ্গলবার আরও পাঁচটি জাহাজে হামলার পর এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ এখন জোটের সীমানায় এসে ঠেকেছে বলে উদ্বেগ বাড়ছে।
রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা ইউক্রেনের রেনি বন্দরে তিনটি পণ্যবাহী জাহাজ এবং ওডেসাগামী আরও দুটি পণ্যবাহী জাহাজে আঘাত হেনেছে। ইউক্রেনের বন্দরগুলো থেকে শস্যসহ কৃষিপণ্য বহনকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো এসব হামলা দেশটির অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ রফতানি পথকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।
লন্ডনের জাহাজ বিমা বাজারের নতুন উচ্চ-ঝুঁকির তালিকায় এখন রোমানিয়া, বুলগেরিয়া ও তুরস্কের জলসীমা ছাড়া পুরো কৃষ্ণ সাগরই অন্তর্ভুক্ত। বেসামরিক নাবিকদের মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ায় কৃষ্ণ সাগরের পথগুলো এখন বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক নৌপথে পরিণত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট বলেন, ‘আজ ন্যাটো রাষ্ট্রদূতরা উত্তর আটলান্টিক পরিষদে বসে কৃষ্ণ সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। পূর্ব সীমান্তজুড়ে আমরা ইতিমধ্যে আমাদের অবস্থান শক্তিশালী করেছি, যার মধ্যে ড্রোন-প্রতিরোধী সক্ষমতাও রয়েছে। ন্যাটো এই অঞ্চলে অতিরিক্ত সম্পদ পাঠাবে, যার মধ্যে নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও ফরেনসিক কাজে সহায়তা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’
এই মোতায়েনের আওতায় থাকছে সামুদ্রিক টহল বিমান, রাডার ব্যবস্থা, ড্রোন এবং গোয়েন্দা কর্মীরা। রাশিয়ার যুদ্ধের ছোঁয়া ন্যাটো এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এবং তার পরিণতিতে জোটের সঙ্গে নতুন ঘর্ষণের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
এরই মধ্যে অভিযোগ উঠেছে, রুশ হামলা ক্রমে বুলগেরিয়া ও রোমানিয়ার জলসীমা এবং একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে ঢুকে আসছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে রোমানিয়া তার আকাশসীমায় সন্দেহভাজন দুটি রুশ ড্রোন ভূপাতিত করতে যুদ্ধবিমান পাঠায়।
রোমানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাডু মিরুৎসা বলেন, ড্রোনগুলো সম্ভবত সর্বশেষ প্রজন্মের রুশ ড্রোন, যেগুলো যুদ্ধবিমানের কাছাকাছি গতিতে উড়ছিল। তিনি বলেন, ‘গত রাতের ড্রোনগুলো ঘণ্টায় ৪৫০ কিলোমিটার গতিতে উড়ছিল, যা থেকে মনে হয় এগুলো টার্বোপ্রপ ইঞ্জিনের রুশ-নির্মিত গেরান-৪ ড্রোন। এই ধরনের ড্রোন আমরা এই প্রথম ভূপাতিত করলাম।’
রোমানিয়া এ বছর এখন পর্যন্ত ৩৫টি অননুমোদিত ড্রোন অনুপ্রবেশ রেকর্ড করেছে, যেখানে ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র নয়টি। গত বছর একটিও ড্রোন ভূপাতিত করতে না পারলেও এ বছর রোমানীয় বাহিনী ছয়টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
গত সপ্তাহে রোমানিয়ার কৃষ্ণ সাগর উপকূলের কাছে ড্রোন হামলায় দুটি রসায়নবাহী ট্যাংকার আঘাতপ্রাপ্ত হয়। দুটি জাহাজই সুলিনা খালের কাছে নোঙর করা ছিল, যে খাল দানিউব নদীকে কৃষ্ণ সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং এটি ইউক্রেনের একটি রফতানি পথ।
গত দুই সপ্তাহে রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার উপকূলের কাছে আরও অন্তত পাঁচটি পণ্যবাহী জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে, এতে ২৩ জন নাবিক নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। এসব ঘটনার বেশিরভাগই ন্যাটো জলসীমার বাইরে ঘটেছে।
ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে বুলগেরিয়া তার ভূখণ্ডে যুদ্ধবিমান ও ড্রোন-প্রতিরোধী ব্যবস্থা মোতায়েনের জন্য ন্যাটোর কাছে আবেদন করেছে। ১৮ অক্টোবর ফ্রান্স রোমানিয়ায় একটি সামুদ্রিক গোয়েন্দা বিমান পাঠিয়েছে।
সামুদ্রিক বিমা ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ সংস্থা অ্যামব্রের মতে, শস্য ও তেলসহ কৃষ্ণ সাগরের পণ্য পরিবহনের ওপর হুমকির কোনো অবসান আপাতত দেখা যাচ্ছে না এবং এই জলপথে চলাচলের বিমা খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে। সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক টোমাস অ্যালেক্সা গত সপ্তাহে বলেন, জুলাই থেকে হামলার গতি তীব্রভাবে বেড়েছে এবং এসব হামলার প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য রুশ বাহিনী দায়ী বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অ্যালেক্সার মতে, প্রাণহানির সাম্প্রতিক বৃদ্ধির পেছনে ‘ডাবল ট্যাপ’ হামলার ভূমিকা রয়েছে, যেখানে আকাশপথের ড্রোনের পাশাপাশি পানিপথের ড্রোনও ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলো কখনো কখনো আধা টন পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করে। দানিউব খাল ব্যবস্থা ব্যবহারকারী ছোট জাহাজগুলো দ্রুত ডুবে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বণিক জাহাজের ওপর হামলা কৃষ্ণ সাগরে নতুন নয়, তবে হামলার সংখ্যা ও ভৌগোলিক পরিধি—দুই দিক থেকেই আমরা তীব্রতা বাড়তে দেখছি।’




