গলছে বরফ, তুঙ্গে ভূ-রাজনীতি: আর্কটিক নিয়ে নতুন কৌশল ঘোষণা করল ইউরোপীয় ইউনিয়ন
জলবায়ু পরিবর্তনে গলছে আর্কটিকের বরফ, খুলছে নতুন নৌপথ আর সম্পদের ভান্ডার—আর সেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না থাকতে আর্কটিক নিয়ে নতুন কৌশল ঘোষণা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। মঙ্গলবার ব্রাসেলসে ‘নর্দার্ন নেইবারহুড’ নামের এই পরিকল্পনা উন্মোচন করা হয়।
নতুন কৌশলটির লক্ষ্য জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উত্তরে বাড়তে থাকা সামরিক ও বাণিজ্যিক তৎপরতার জন্য প্রস্তুত থাকা। এতে অঞ্চলটিতে নতুন পরিবহন, গবেষণা ও নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ার কথা বলা হয়েছে।
কৌশলটি উন্মোচন করে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেন, ‘আর্কটিক এমন এক জায়গা যেখানে ভূ-রাজনীতির টেকটোনিক প্লেটগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। আর এটি অন্য কারো সীমান্ত নয়। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নেরই অংশ।’
তিনি রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি এবং নতুন নৌপথ ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতাকে ইউরোপের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নতুন করে গড়ে দেওয়ার শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
নতুন নীতিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, রাশিয়া আর্কটিকে তার সামরিক উপস্থিতি পুনর্নির্মাণ করছে এবং অঞ্চলটিতে চীনের কৌশলগত আকাঙ্ক্ষাও বাড়ছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ২০২৭ সালে স্যাটেলাইট ও সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করে একটি পাইলট গবেষণা প্রকল্প শুরুর পরিকল্পনা করেছে ইইউ; রাশিয়ার ছায়া নৌবহরের জাহাজ শনাক্তে জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্যও ভাগাভাগি করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদে ইইউ একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা কেন্দ্র গড়তে চায়, যেখানে সাগরতলের কেবল কাটা থেকে অবৈধ মাছ ধরা পর্যন্ত নানা হুমকির গোয়েন্দা তথ্য একত্র করা হবে। উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিকের সাগরতল কেবল পর্যবেক্ষণ ও সুরক্ষায় ন্যাটোর সঙ্গে একটি ‘আর্কটিক কেবল হাব’ স্থাপনের কথাও বলা হয়েছে কৌশলে। তবে এসব প্রকল্পে অর্থায়ন নিয়ে কোনো তথ্য নেই কৌশলপত্রে।
ফিনল্যান্ডের এমইপি মিকা আলতোলা বলেছেন, আর্কটিক নিয়ে এই নতুন মনোযোগ বহুদিন আগেই আসা উচিত ছিল। তাঁর ভাষ্য, ‘ইউরোপ আর্কটিক নিয়ে যথেষ্ট ভাবেনি। বরফ গলা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এটি হয়ে উঠছে পরবর্তী বড় প্রতিযোগিতার মঞ্চ। আর তা হলে রাশিয়া, চীন এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে ইউরোপের অবস্থান কী হবে?’
জ্বালানি প্রশ্নে ইইউ তার পুরনো প্রতিশ্রুতিতেই অটল রয়েছে—আর্কটিকে জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন না করা। কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, ‘আর্কটিক অঞ্চলসহ সব জায়গায় তেল, কয়লা ও গ্যাস মাটির নিচে রাখা নিশ্চিত করতে ইইউ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ বদলে অঞ্চলটিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ব্রাসেলস। তবে আগের নীতির বৈশ্বিক পর্যায়ে উত্তোলন বন্ধে বিশ্বকে রাজি করানোর অঙ্গীকারটি এবার বাদ পড়েছে।
সমাজতান্ত্রিক এমইপি দেলারা বুরখার্ড বলেছেন, আর্কটিকে তেল-গ্যাস খননে কমিশনের বিরোধিতা অব্যাহত থাকা ভালো; কিন্তু বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার জন্য চাপ না দিলে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সুরক্ষার দাবি তোলার ক্ষমতা দুর্বল হবে এবং বিশ্বের অন্যতম ভঙ্গুর পরিবেশ-ব্যবস্থাকে শোষণের দরজা অন্যদের জন্য খোলা থেকে যাবে।
ইইউর আগের আর্কটিক নীতি ২০২১ সালে তৈরি হয়েছিল, যেখানে মূল গুরুত্ব ছিল পরিবেশ রক্ষায় এবং আর্কটিক তেল-গ্যাস উত্তোলনে আন্তর্জাতিক স্থগিতাদেশের লক্ষ্য ছিল। নতুন কৌশলে সেই ভারসাম্য সরে গেছে নিরাপত্তা, নৌচলাচল ও সম্পদ আহরণের দিকে। উল্লেখ্য, ইইউতে বড় পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহকারী নরওয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, জোটের অবস্থান যাই হোক, তারা আর্কটিকে খনন চালিয়ে যাবে।
অন্যদিকে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের উৎস খুঁজছে ইইউ। নতুন কৌশল অনুযায়ী কানাডা, গ্রিনল্যান্ড, নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অঞ্চলটিতে কাঁচামাল প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হবে—তবে সর্বোচ্চ সামাজিক, পরিবেশগত ও শাসন মানদণ্ড মেনে এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রতি সম্মান রেখে স্থানীয় সম্প্রদায়ের উপকারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
কৌশলের অংশ হিসেবে নরওয়ে, আইসল্যান্ড, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইইউর বিদ্যমান অংশীদারত্ব নতুন রূপ পাচ্ছে; নিয়মিত শীর্ষ বৈঠকে যৌথ অগ্রাধিকার ঠিক করা ও প্রকল্প চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে, গলতে থাকা উত্তর মেরু এখন শুধু পরিবেশের প্রশ্ন নয়—ইইউর চোখে তা নিরাপত্তা ও অর্থনীতির কেন্দ্রীয় মঞ্চ, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দিতেই এই নতুন কৌশল।





