অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে ৬৪ জেলায় সচেতনতা ও স্ক্রিনিং চালুর আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের
অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং রোগটি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে দেশের ৬৪ জেলায় সমন্বিত কর্মসূচি পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
তিনি বলেছেন, অস্টিওপোরোসিস একটি নীরব রোগ। এই রোগে হাড় দুর্বল, পাতলা ও ছিদ্রযুক্ত হয়ে পড়ে, ফলে হঠাৎ হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এর কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম করার সক্ষমতাও কমে যায়।
মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল ভবনের কনভেনশন হলে বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক বৈজ্ঞানিক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) ‘অস্টিওপোরোসিস: প্রতিরোধযোগ্য মহামারি’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ অস্টিওপোরোসিসের কারণে হাড় ভাঙা ও দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের সব অঞ্চলের মানুষের কাছে রোগটির প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়। তবে বর্তমানে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। আক্রান্ত বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
উত্তর-মধ্য বাংলাদেশের ৪৫ থেকে ৮০ বছর বয়সী নারীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই গবেষণায় অস্টিওপোরোসিসের প্রাদুর্ভাব পাওয়া গেছে ৪০ শতাংশ এবং অস্টিওপেনিয়ার প্রাদুর্ভাব ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৮৩ শতাংশের বেশি নারীর হাড়ের ঘনত্বে ঘাটতি ছিল।
এর পাশাপাশি শহরাঞ্চলে ৪৬ থেকে ৬৫ বছর বয়সী নারীদের ওপর পরিচালিত একটি পুরোনো হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় অস্টিওপোরোসিসের প্রাদুর্ভাব ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অস্টিওপেনিয়ার প্রাদুর্ভাব ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ পাওয়া যায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর নারীরা উন্নত দেশগুলোর নারীদের তুলনায় এই রোগে বেশি আক্রান্ত হন। বাংলাদেশে কতসংখ্যক নারী অস্টিওপোরোসিসে ভুগছেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নির্ধারণ করা কঠিন। তাই রোগটির প্রকৃত চিত্র নিরূপণে আরও গবেষণা ও নিয়মিত স্ক্রিনিং প্রয়োজন।
কন্যাশিশু ও তরুণীদের জন্য উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে অস্টিওপোরোসিস এবং এই রোগের জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। প্রতিরোধের এই আগাম ভাবনাকে তিনি কর্মসূচির মূল দিকগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরেন।
প্রতিরোধে কয়েকটি পদক্ষেপের প্রস্তাব তুলে ধরে ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, প্রথমত একটি অস্টিওপোরোসিস সোসাইটি গঠন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে সমন্বিতভাবে দেশের ৬৪টি জেলায় সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা সম্ভব হবে। কোনো অঞ্চলের মানুষ যেন সচেতনতা ও স্ক্রিনিংয়ের অভাবে এই রোগের ব্যথা ও দুর্ভোগে না ভোগেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, চিকিৎসক সমাজ জনগণকে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে এবং আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি নিয়োজিত এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমেও দেশব্যাপী এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, প্রতিবছর অস্টিওপোরোসিস সচেতনতা মাস পালনের প্রস্তাব দেন তিনি। এই উপলক্ষে নিয়মিত অনুষ্ঠান, র্যালি ও জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযানের আয়োজন করা যেতে পারে। জেলা হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের জন্য আধুনিক রোগনির্ণয় পদ্ধতি নিয়ে সেমিনার আয়োজনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি, হাড়ের খনিজ ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং শৈশবে ক্যালসিয়াম গ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত পুষ্টিগত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসা-অঙ্গনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা এসব বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারেন।
তিনি হাড়ের খনিজ ঘনত্ব নির্ণয়ে স্ক্রিনিং ক্যাম্প আয়োজন এবং নিয়মিত বিরতিতে কমিউনিটিভিত্তিক স্ক্রিনিংয়ের সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান। যেসব এলাকায় হাড়ের খনিজ ঘনত্ব নির্ণয়ের ব্যবস্থা নেই, সেখানে ফ্র্যাকচার রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট টুল ব্যবহার করে হাড় ভাঙার ঝুঁকি মূল্যায়নের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
সেমিনারে ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ড্যাবের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং ডা. আব্দুস সালাম এমপি। অনুষ্ঠানে প্রশ্নোত্তর পর্ব, প্যানেল আলোচনা ও কুইজ অনুষ্ঠিত হয়।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক ডা. এরফানুল হক সিদ্দিকী, অধ্যাপক ডা. ফারুক কাশেম, অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন, অধ্যাপক ডা. শামীম আহমেদ, ডা. শেখ ফরিদ আহমেদ এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ বেলালুল ইসলাম। ‘আজীবন হাড় গড়ুন, সুরক্ষা দিন ও শক্তিশালী করুন’ প্রতিপাদ্যে এবারের কর্মসূচি পালিত হচ্ছে, যাতে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা দিচ্ছে ইনসেপ্টা। হাড়ের ক্ষয়জনিত এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ২০ অক্টোবর বিশ্ব অস্টিওপোরোসিস দিবস পালন করা হয়।




