নীরবে বছরের পর বছর বাড়ে ফুসফুসের ক্যানসার: কারা স্ক্রিনিং করাবেন, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ফুসফুসের ক্যানসার বছরের পর বছর ধরে কোনো লক্ষণ ছাড়াই নীরবে বেড়ে উঠতে পারে। উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই ধরা পড়লে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায় — তবু যুক্তরাষ্ট্রে যাঁরা স্ক্রিনিংয়ের যোগ্য, তাঁদের মাত্র ১৫ শতাংশই আসলেই পরীক্ষাটি করান। চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা, এই অবহেলার অর্থ প্রতিবছর হাজার হাজার প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের থোরাসিক সার্জন ও আমেরিকান কলেজ অব সার্জনস কমিশন অন ক্যানসারের চেয়ারম্যান ড্যানিয়েল জে. বোফা ফুসফুসের ক্যানসার স্ক্রিনিংকে বেঁচে থাকার হার বাড়ানোর ‘সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়গুলোর একটি’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষ্যে, ‘এটি ফুসফুসের ক্যানসারে মৃত্যুর সম্ভাবনা ২০ শতাংশ কমিয়ে দেয়।’
স্ক্রিনিং বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে লো-ডোজ সিটি স্ক্যান — একটি কম মাত্রার বিকিরণের সিটি পরীক্ষা, যা ফুসফুসের ছোট্ট অস্বাভাবিকতাও ধরে ফেলতে পারে। বোফা জানান, এই স্ক্যান করতে মাত্র কয়েক মিনিট লাগে এবং এমআরআইয়ের মতো বদ্ধ জায়গায় ঢুকতে হয় না, ফলে অনেকের ভয় পাওয়ার কারণ নেই।
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির (এসিএস) নির্দেশিকা অনুযায়ী, যাঁদের বয়স ৫০ থেকে ৮০ বছর এবং যাঁরা বর্তমানে ধূমপান করেন বা অতীতে করেছেন এবং অন্তত ২০ ‘প্যাক-ইয়ার’ ধূমপানের ইতিহাস আছে, তাঁদের প্রতিবছর লো-ডোজ সিটি স্ক্যান করানো উচিত। প্যাক-ইয়ার হলো ধূমপানের পরিমাণ মাপার একটি হিসাব — যেমন দিনে এক প্যাকেট করে ২০ বছর, অথবা দিনে দুই প্যাকেট করে ১০ বছর।
পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্তের আগে প্রত্যেকেরই নিজের চিকিৎসকের সঙ্গে স্ক্রিনিংয়ের উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, উপকারিতা, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ক্ষতির দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করা উচিত বলে পরামর্শ দিয়েছে এসিএস। যাঁরা এখনো ধূমপান করেন, তাঁদের ধূমপান ছাড়ার পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে নির্দেশিকায়।
অন্যদিকে যাঁদের গুরুতর অন্য স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, যা সম্ভবত আয়ু সীমিত করে দেবে, তাঁদের স্ক্রিনিং না করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। একইভাবে ফুসফুসের ক্যানসার ধরা পড়লেও যাঁরা চিকিৎসা নিতে পারবেন না, তাঁদের ক্ষেত্রেও স্ক্রিনিংয়ের সুপারিশ করা হয় না।
লক্ষণের কথা বলতে গিয়ে ফ্লোরিডার টাম্পায় মফিট ক্যানসার সেন্টারের অনকোলজিস্ট ল্যারি রবিনসন বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ের ফুসফুসের ক্যানসারে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো লক্ষণ থাকে না। যাঁদের লক্ষণ দেখা দেয়, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ হলো দীর্ঘদিনের কাশি, শ্বাসকষ্ট অথবা কাশির সঙ্গে রক্ত যাওয়া — অর্থাৎ সবগুলোই ফুসফুস-সংক্রান্ত।
রবিনসন আরও জানান, অকারণে ওজন কমে যাওয়াও যেকোনো ধরনের ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। আর দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথার মতো স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিলেও চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত, কারণ তা অবহেলার বিষয় নয়।
অনেকেই মনে করেন ফুসফুসের ক্যানসার শুধু ধূমপায়ীদের রোগ। কিন্তু তথ্য বলছে ভিন্ন কথা — প্রতি সাতটি ফুসফুসের ক্যানসারের একটি এমন ব্যক্তির হয়, যিনি জীবনে কখনো ধূমপান করেননি। তা সত্ত্বেও কখনো ধূমপান না করা ব্যক্তিদের জন্য এখনো নির্দিষ্ট কোনো স্ক্রিনিং নির্দেশিকা নেই।
বোফা জানান, কারা ধূমপান না করেও স্ক্রিনিংয়ে উপকৃত হবেন, তা খুঁজে বের করা এখন ‘তীব্র গবেষণার’ বিষয়। আপাতত যাঁদের পরিবারে সরাসরি কারো ফুসফুসের ক্যানসার হয়েছে, তাঁদের বার্ষিক স্ক্রিনিং বিবেচনা করা উচিত; এশীয় নারীদের মতো উচ্চ ঝুঁকির জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও একই পরামর্শ। তাঁর প্রত্যাশা, ‘আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে যাঁরা কখনো ধূমপান করেননি অথচ ঝুঁকিতে আছেন, তাঁদের জন্য আরও ভালো নির্দেশনা পাওয়া যাবে।’
ভবিষ্যতের দিকেও তাকিয়ে আছেন বোফা। তাঁর আশা, ‘চার-পাঁচ বছরের মধ্যে স্ক্রিনিং সিটি স্ক্যান হবে শুধু নিশ্চিতকরণের ধাপ — তার আগে চিকিৎসকের চেম্বারেই একটি রক্ত পরীক্ষায় প্রাথমিক সংকেত পাওয়া যাবে।’ এমন ব্যবস্থা এলে স্ক্রিনিং সহজ হবে এবং আরও বেশি ক্যানসার ধরা পড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ভয়ের কারণে অনেকে পরীক্ষা এড়িয়ে যান, কিন্তু বোফার মতে সেই ভয়ের ভিত্তি এখন অনেকটাই বদলে গেছে। চিকিৎসায় অগ্রগতির ফলে অগ্রসর পর্যায়েও বেঁচে থাকার হার বেড়েছে, তাই স্ক্রিনিংকে ‘মৃত্যুদণ্ডের রায়’ হিসেবে দেখা উচিত নয়। বেশির ভাগ স্ক্রিনিংয়ে ধরা পড়া ফুসফুসের গুটিকা বা অস্বাভাবিকতা আসলে সংক্রমণ, ক্ষতচিহ্ন বা প্রদাহ — টিউমার নয়। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে স্ক্রিনিং অন্য স্বাস্থ্য সমস্যাও ধরে ফেলে, যেমন হৃদ্ধমনি শক্ত হয়ে যাওয়া। উপসর্গহীন এই রোগের বিরুদ্ধে তাই বিশেষজ্ঞদের একটাই পরামর্শ — যোগ্য হলে পরীক্ষাটি করিয়ে নিন।




