সহিংস বিক্ষোভ ও লুটপাটের পর ফ্রান্সের একাধিক শহরে আংশিক কারফিউ, প্রায় আড়াই হাজার আটক
তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সংঘাত ও লুটপাটের মুখে রাজধানী প্যারিস, লিল ও নিসসহ একাধিক শহরের নির্দিষ্ট অংশে সান্ধ্য আইন বা কারফিউ বলবৎ করেছে ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় ও আংশিক বিধিনিষেধকেই আপাতত সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান হিসেবে দেখছে সরকার।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে স্থানীয় সময় সোমবার এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। রাজধানী প্যারিসে সামগ্রিক কারফিউ কার্যকরের সম্ভাবনা নাকচ করে দিলেও জরুরি অবস্থা জারির বিকল্পটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকরনু। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তাঁর সংকল্প অবিচল।
প্যারিস পুলিশের পক্ষ থেকে রাজধানীর নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সন্ধ্যা আটটার পর সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রজাতন্ত্র চত্বর বা প্লেস দ্য লা রিপাবলিক ও লে আলে এলাকায় রাত এগারোটা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে। পুলিশ এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় জানিয়েছে, এই নিয়মগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসনের সম্মতিতে লিল, দুয়ে, ভাতিগ্নি ও দানাঁ শহরে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আগামী দুই দিন রাত আটটা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিসের কেন্দ্রস্থলেও অপ্রাপ্তবয়স্কদের রাতের চলাচলে বিধিনিষেধের আদেশে স্বাক্ষর করার বিষয়টি ভিডিও বার্তায় নিশ্চিত করেছেন মেয়র এরিক সিওত্তি। অন্যদিকে মার্সেই নগরীতে যেকোনো ধরনের সমাবেশ ও বিক্ষোভ পুরোপুরি নিষিদ্ধ রয়েছে।
আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র ছয় মাস বাকি থাকা অবস্থায় দেশব্যাপী এই লুটপাট ও সংঘাত ফ্রান্সের নাজুক অর্থনীতি এবং আকাশচুম্বী ঋণসংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ৫ নভেম্বর নতুন করে ধর্মঘট ও জমায়েতের ঘোষণা দিয়েছে ফরাসি ট্রেড ইউনিয়নগুলো। ফলে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য চরম বামপন্থী পক্ষগুলোকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী লেকরনু। তাঁর মন্তব্য, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশের ভেতরে গভীর অস্থিরতা তৈরি করতে চায় এমন একটি চরম বামপন্থী আন্দোলন আসলেই রয়েছে। এই বক্তব্য রাজনৈতিক বিতর্ক আরও উসকে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কট্টর বাম ঘরানার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জঁ-ল্যুক মেলেশোঁ অভিযোগের স্বপক্ষে প্রমাণ হাজির করার দাবি তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, নতুবা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা চাওয়া উচিত, চুপ থাকা উচিত এবং অস্থিরতার আগুন উসকে দেওয়া বন্ধ করা উচিত।
ব্যবসায়িক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে ফরাসি বণিক ও খুচরা বিক্রেতা ফেডারেশন জানিয়েছে, সপ্তাহান্তের তাণ্ডবে প্রায় তিন হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফেডারেশন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, লুটপাট হওয়া প্রতিটি দোকানের পেছনে রয়েছেন এমন ব্যবসায়ী, কর্মী ও পরিবার, যাদের বহু বছরের পরিশ্রম ও প্রচেষ্টা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে কর ছাড়ের দাবি উঠলে প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার থেকেই কর্মী ছাঁটাই রোধে বিশেষ ব্যবস্থা বা ফার্লো কার্যকরের কথা জানান। অর্থাৎ ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কর্মীদের চাকরি যাতে হঠাৎ না যায়, সেদিকে সরকার নজর দেবে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল মন্ত্রী এক্সে দেওয়া বার্তায় জানিয়েছেন, সহিংসতায় লুট হওয়া সামগ্রী বিক্রি করা অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপন দ্রুত প্রত্যাহার এবং জড়িতদের শনাক্তে সহায়তা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। লুটের মাল অনলাইনে বিক্রি ঠেকানো এখন প্রশাসনের আরেকটি অগ্রাধিকার।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অস্থিরতার জেরে এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার চারশ জনকে আটক করা হয়েছে। সহিংসতাকালে শনিবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে একজনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং কর্তব্যরত প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এই সংখ্যাগুলো সহিংসতার মাত্রা কতটা ব্যাপক ছিল, তা বুঝিয়ে দেয়।
এখন সবার নজর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় তার দিকে। কারফিউ ও নিষেধাজ্ঞায় রাস্তার সহিংসতা কমে কি না, ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ঘোষিত ৫ নভেম্বরের কর্মসূচি কত বড় আকার নেয় এবং নির্বাচনের ছয় মাস আগে সরকার রাজনৈতিক চাপ কীভাবে সামলায় — এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আগামী দিনে ফ্রান্সের পরিস্থিতি নির্ধারণ করবে।






