আলবেনিয়ায় সপ্তম দিনেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, আহত প্রায় ৩০০
আলবেনিয়ায় টানা সপ্তম দিনের মতো দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সহিংস সংঘর্ষ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এডি রামাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাওয়া বিক্ষোভকারীদের অনেকেই মাধ্যমিক স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সোমবারের সহিংসতার আগ পর্যন্ত ২৯৫ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৮৬ জনই পুলিশ কর্মকর্তা।
বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নত পরিবেশ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং প্রধানমন্ত্রী রামার পদত্যাগ। তিরানায় একটি পুলিশ স্টেশন ও সরকারি ভবনগুলোতে হামলার ঘটনা ঘটেছে এই বিক্ষোভের মধ্যে। উপদ্রুত তিরানার সড়কগুলোতেই এখন প্রতিদিন সংঘর্ষের চিত্র দেখা যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী এডি রামা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। রোববার পুলিশের দিকে ছোড়া একটি পাথর হাতে নিয়ে গম্ভীর মুখের পুলিশ প্রধানদের তিনি বলেন, ‘যে মুহূর্তে রাষ্ট্র এদের সঙ্গে আলোচনায় বসবে, সেই মুহূর্তে রাষ্ট্রের পতন ঘটবে।’ তার এই বক্তব্য সরকারের আপসহীন মনোভাবই স্পষ্ট করেছে।
রামা আরও দাবি করেছেন, বিক্ষোভকারীরা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘অন্ধকার শক্তি’ দ্বারা উগ্রপন্থায় প্ররোচিত হয়েছেন। তার ভাষায়, ‘আলবেনিয়া একটি সুসমন্বিত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।’ তবে বিক্ষোভকারীরা এই অভিযোগ মানতে নারাজ; তাদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অবহেলার অভিযোগ।
তিরানার রিনিয়া পার্ক, যা ইয়ুথ পার্ক নামেও পরিচিত, সেখানে উজ্জ্বল অক্টোবরের রোদে দেখা গেছে মানুষ আলগা পাথর তুলে নিচ্ছেন — পুলিশের সঙ্গে পরবর্তী লড়াইয়ের ‘গোলাবারুদ’ হিসেবে। তাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি; সাঁজোয়া ট্রাকের নেতৃত্বে পুলিশের একটি বহর প্রশস্ত সড়ক ধরে এগিয়ে আসে, জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে ছুড়তে।
দাঙ্গা পুলিশের দলগুলো মূলত শিক্ষার্থীদের ভিড়কে পার্কের ভেতর ধাওয়া করে। বিক্ষোভকারীরা একটি ক্যাফেতে আশ্রয় নেন, যেখানে ওয়েটারদের চোখও কাঁদানে গ্যাসে জ্বালা করে ওঠে। গাছের নিচে হলুদ রিফ্লেক্টর জ্যাকেট পরা স্বেচ্ছাসেবীরা গ্যাসে আক্রান্তদের সাহায্যে দাঁড়িয়ে থাকেন। একজন তরুণকে পুলিশের সঙ্গে তর্ক করতে দেখা যায়, এরপর সেই পুলিশ একেবারে কাছ থেকে তার মুখে পিপার স্প্রে ছোড়েন।
মানবাধিকার আইনজীবী জেন্টিয়ান সেজরানি পুলিশের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন। গ্রেপ্তার হওয়া ১০০ জনেরও বেশি মানুষকে আইনি সহায়তা দেওয়া এই আইনজীবী বলেন, ‘পুলিশের পদক্ষেপ প্রায়ই বিশৃঙ্খল ও নির্বোধের মতো। আদালতে পুলিশ খুব কমই প্রমাণ হাজির করে।’ তার মক্কেলদের মধ্যে এমন একজনও আছেন, যাকে বাসস্টপে যাওয়ার পথে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল — বিক্ষোভের সঙ্গে যার কোনো সম্পর্কই ছিল না বলে তিনি জানান।
সেজরানির পর্যবেক্ষণ, ‘যারা আসলে পুলিশের দিকে জিনিস ছোড়ে, তারা খুব কমই ধরা পড়ে, কারণ তারাই সবচেয়ে দ্রুত দৌড়ায়।’ পুলিশ সদস্যরা সহকর্মীদের ওপর সহিংসতায় যতটা ক্ষুব্ধ, বিক্ষোভকারীরাও পুলিশের কঠোর কৌশলে ততটাই ক্ষুব্ধ — আর তার ফল হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা।
আন্দোলনটি নেতৃত্বহীন হলেও অভিজ্ঞ মুখের অভাব নেই। ২৭ বছর বয়সী কর্মী সিডোরেলা ভাতনিকাজ, একজন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, যার পেছনে রয়েছে আট বছরের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের অভিজ্ঞতা। তিনি তার দিনের বর্ণনা দেন — সকালে সব দলের সঙ্গে সমন্বয়, কোথায় বিক্ষোভ হচ্ছে তা দেখা, আইনজীবী বা প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম লাগবে কি না তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিবাদে থাকা বন্ধু ও পরিবারের সদস্যরা ঠিক আছেন কি না তা খোঁজ নেওয়া। দিনের বড় অংশ কাটে এক বিক্ষোভ থেকে আরেক বিক্ষোভে, অনেকটাই পুলিশের ধাওয়া থেকে দৌড়ে।
ভাতনিকাজ কর্তৃপক্ষের ওপর সহিংসতায় অস্বস্তি বোধ করলেও তার জন্য পুলিশকেই দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘যখন দেখি মানুষ পুলিশের দিকে পাথর ছুড়ছে, আমি তাদের রাগ বুঝতে পারি। আমি বিচার করি না। আমি খুশি নই, কিন্তু তাদের কথা শোনার আর কোনো উপায় নেই।’ তার ভাষায়, এই তরুণরা এমন পরিবার থেকে এসেছেন, যাদের সদস্যদের দেশ ছাড়া ছাড়া অন্য পথ ছিল না — গত এক দশকে এক মিলিয়ন মানুষ দেশ ছেড়েছেন। ‘তাদের শুধু লুটই করা হয়নি, তাদের ওপর অত্যাচার হয়েছে, অবহেলা করা হয়েছে, আর এখন তাদের মারধরও করা হচ্ছে।’
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছিলেন, তিনি পদত্যাগ করলে কী হবে। ভাতনিকাজের জবাব, ‘আমাদের এক বছরের জন্য একটি তত্ত্বাবধায়ক (টেকনোক্র্যাট) সরকার দরকার, যাতে দেশকে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করা যায়।’ তিনি রামার বিরুদ্ধে আগের নির্বাচনে কারচুপি এবং ধনী বিদেশি বিনিয়োগকারী ও সংগঠিত অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মেলানোর অভিযোগ তুলেছেন।
ভাতনিকাজ বলেন, আলবেনিয়ার তরুণরা বিশ্বজুড়ে তাদের সমসাময়িক জেন-জি বিক্ষোভকারীদের দেখে উৎসাহ পাচ্ছেন। তার কথায়, ‘আমি দেখেছি আমার মা-বাবার প্রজন্ম সারাজীবন কাজ করে স্বপ্ন দেখেছে এমন একটি গণতান্ত্রিক সমাজের, যেখানে তারা মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবেন। তা কখনো হয়নি।’ রামা ১৩ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন এবং শতাব্দীর শুরু থেকে আলবেনিয়ার রাজনীতিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব; তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সপ্তম দিনের সংঘর্ষের পর এখন প্রশ্ন — এই আন্দোলন কোন দিকে মোড় নেয়।





