তহবিল সংকটে গাজায় সাহায্য কমাচ্ছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, সুবিধাভোগী কমছে ১৬ লাখ থেকে ১১ লাখে
গাজা উপত্যকায় খাদ্য সাহায্যের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বলেছে, তহবিল সংকটের কারণে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটিতে ‘জীবনরক্ষাকারী সহায়তা ব্যাপকভাবে কমাতে’ তারা বাধ্য হচ্ছে। শীত আসার মুখে এবং অনেক পরিবার এখনো নিজেদের খাওয়ানোর সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সময়েই এই ছাঁটাই আঘাত হানছে।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘের এই সংস্থার সাহায্য পাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যাবে — ১৬ লাখ থেকে নেমে আসবে ১১ লাখে। গাজার প্রায় পুরো ২১ লাখ জনসংখ্যাই এখনো বাস্তুচ্যুত, আর তাদের দুই-তৃতীয়াংশ বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।
এর একটি প্রভাব পড়বে কমিউনিটি রান্নাঘরগুলোর গরম খাবারে। বর্তমানে প্রতিদিন দেওয়া ২ লাখ ৫০ হাজার গরম খাবার কমিয়ে ১ লাখ ৫০ হাজারে নামিয়ে আনা হবে।
দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলো — যেমন ইসরায়েলের সামরিক নিয়ন্ত্রণ এলাকা চিহ্নিত তথাকথিত ইয়েলো লাইনের কাছে থাকা পরিবারগুলো — প্রতিদিনের বদলে এক দিন পর পর খাবার পাবে।
খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকার একটি শিবিরে বাস্তুচ্যুত পাঁচ সন্তানের মা মারভাত আল-সাতারি এই খবরকে বলেছেন ‘বিপর্যয়’। তিনি বলেন, ‘এটা বিপর্যয়! এই কমানো রেশন দিয়ে আমরা কী করব? ছোটদের খাওয়াব কীভাবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘কখনো কখনো আমরা খাওয়ার জন্য এই খাবারের অপেক্ষাতেই থাকি।’
আল-মাওয়াসিরই তিন সন্তানের মা সাওসান বাহলুল বলেন, ‘এটা আমাদের অনেক ক্ষতি করবে। দৈনিক সাহায্যটা কোনোমতে কাজ চালিয়ে নিচ্ছিল, কিন্তু এখন তা দুই দিনে একবার হবে।’ তিনি জানান, কমিউনিটি রান্নাঘর থেকে দেওয়া খাবার — সাধারণত পাস্তা বা ডাল, মাঝে মাঝে আলু ও বেগুন — এমনিতেই তার পরিবারের জন্য খুবই কম।
ডব্লিউএফপির ফিলিস্তিন পরিচালক শন হিউজ স্পষ্ট করে বলেছেন, ছাঁটাই করা হচ্ছে অর্থের কারণে, ‘চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে নয়, কিংবা আমাদের প্রবেশাধিকার না থাকার কারণেও নয় — প্রবেশাধিকার আমাদের আছে।’
ইতোমধ্যে জুলাই থেকে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের নগদ সহায়তা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে স্থানীয় বাজার থেকে খাবার কেনার অর্থ তাদের হাতে কমেছে। এখন ডব্লিউএফপির দেওয়া ময়দার ব্যাগ ও রেশন বাক্স পাওয়া গাজাবাসীর সংখ্যা প্রতি মাসে ১১ লাখ থেকে কমে ৬ লাখে নেমে আসবে।
২০২৬ সালে ফিলিস্তিনি কার্যক্রমের জন্য ডব্লিউএফপি আগের বছরগুলোর তুলনায় অর্ধেকেরও কম তহবিল পেয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, আগামী ছয় মাসে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কার্যক্রম চালিয়ে রাখতে তাদের জরুরিভাবে ৪৫ কোটি ডলার (৩৩ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড) প্রয়োজন।
হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে এক বছর আগে যুদ্ধবিরতি হওয়া সত্ত্বেও গাজায় মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহই রয়ে গেছে। কোনো পুনর্গঠন হয়নি, পুনরুদ্ধারও সামান্য; ক্রসিং দিয়ে পণ্য প্রবেশে ইসরায়েল কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। খাবারের বাজার এখন ভালোভাবে মজুত থাকলেও তা কেনার সামর্থ্য খুব কম মানুষেরই আছে, কারণ গাজার ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ বেকার।
গাজা সিটিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত নিজের বাড়ির ধ্বংসস্তূপে আটজনের পরিবার নিয়ে বসবাসকারী দালাল আল-দাহদুহ বলেন, ‘ময়দা যথেষ্ট নয়, খাবারের বাক্সও যথেষ্ট নয়।’ নতুন ছাঁটাই ‘বড় প্রভাব’ ফেলবে বলে তিনি আশঙ্কা করেন। তিনি বলেন, ‘আগে, আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের নিজের বাড়ি ছিল, চমৎকার জীবন ছিল। এখন আমরা পুরোপুরি সাহায্যের ওপর বেঁচে আছি, ডব্লিউএফপির ভাউচারসহ।’
জ্বালানি গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার রাস্তা থেকে প্লাস্টিক ও কার্ডবোর্ড খুঁজতে শিশুদের পাঠায় — তা পুড়িয়েই রুটি বানানো বা খাবার গরম করা হয়। হিউজ বলেন, ‘খাদ্য সহায়তায় ছাঁটাই তিন বছর ধরে পরিবারগুলোর ভোগা কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দেবে।’ আপাতত সংস্থাটি গাজার এক-তৃতীয়াংশ রুটির জোগান দেওয়া বেকারিগুলোকে সহায়তা এবং প্রায় তিন লাখ নারী ও শিশুকে পুষ্টি সহায়তা চালিয়ে যেতে পারবে। সামনে শীত — তহবিলের ৪৫ কোটি ডলার জোগাড় না হলে এই ছাঁটাই আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড়।





