রপ্তানির জোরে চীনের অর্থনীতি বাড়ল ৪.৫ শতাংশ, ভেতরের দুর্বলতা কাটেনি
শক্তিশালী রপ্তানির ওপর ভর করে জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে চীনের অর্থনীতি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৫ শতাংশ বেড়েছে। সোমবার ঘোষিত এই সরকারি হিসাব প্রত্যাশার চেয়ে ভালো, আর এর মধ্য দিয়ে দেশটি বার্ষিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের কাছাকাছি এগিয়ে গেল।
এর আগের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৩ শতাংশ, যা তিন বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ধীর গতি ছিল। সেই তুলনায় এবার গতি খানিকটা বেড়েছে।
চীনের নেতৃত্ব ২০২৬ সালের জন্য ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা গত বছরের ৫ শতাংশ সম্প্রসারণের চেয়ে কম। চলতি মাসের শুরুতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এ বছর চীনের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪.৫ শতাংশ করেছে—বেইজিংয়ের লক্ষ্যসীমার একেবারে নিচের ধাপে।
রপ্তানি এখনো অর্থনীতির হাতে গোনা উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি। গত মাসে রপ্তানি ৩৬ শতাংশ লাফ দেওয়ার পর জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৯৩৮ বিলিয়ন ডলার। এই ধারা চললে গত বছরের রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্ক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ধাক্কা দিয়েছে, ফলে চীনা রপ্তানিকারকরা ঝুঁকেছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের দিকে। প্রবৃদ্ধির নেতৃত্বে রয়েছে সেমিকন্ডাক্টরসহ উচ্চপ্রযুক্তি পণ্য এবং হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ি।
পশ্চিমা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ থেকে নিজেকে রক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে চীন সৌর ও বৈদ্যুতিক গাড়ির মতো খাতে বিপুল ভর্তুকিসহ বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। তবে এর সঙ্গে সমস্যাও তৈরি হয়েছে।
উৎপাদন দ্রুত বাড়লেও ভোগ পিছিয়ে থাকায় উৎপাদিত পণ্যের বড় অংশ প্রতিযোগিতামূলক দামে বিদেশে বিক্রি হচ্ছে। বিএনপি পারিবা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ একাতেরিনা বিগোসের মতে, এই প্রযুক্তিনির্ভর, রপ্তানিমুখী মডেল সীমিত কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি তৈরি করেছে, এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত চাকরি হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে।
কনফারেন্স বোর্ডের এশিয়া-প্যাসিফিক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ম্যাক্স জেংলাইনের মতে, সরকারি প্রবৃদ্ধির প্রধান সংখ্যাটি অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে ‘দিন দিন দুর্বল সূচক’ হয়ে উঠছে। চমকপ্রদ সংখ্যা সত্ত্বেও তা ‘শিল্প, অঞ্চল ও পরিবারগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান’ আড়াল করে বলে মনে করেন তিনি; তাঁর মতে, বাইরের চাপ সামলানোর চেয়ে ভেতরের ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলা বেইজিংয়ের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
দেশের ভেতরে চাহিদা নরম হয়ে পড়েছে—বছরের পর বছর ধরে চলা আবাসন খাতের মন্দা পরিবারগুলোর সম্পদ ক্ষয় করেছে এবং সঞ্চয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে গাড়ি রপ্তানির চিত্রও চোখে পড়ার মতো। চীন অটোমোবাইল প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে চীন বিদেশে পাঠিয়েছে প্রায় ৯ লাখ ১৯ হাজার যাত্রীবাহী গাড়ি, যার পেছনে রয়েছে প্লাগ-ইন হাইব্রিড ও সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক মডেলের জোরালো বিদেশি চাহিদা। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে রপ্তানি ছাড়িয়েছে ৭১ লাখ যাত্রীবাহী গাড়ি—গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।
তবে সস্তা চীনা আমদানি নিজেদের শিল্প ও বাণিজ্য ভারসাম্যের জন্য হুমকি—এই আশঙ্কা বেইজিংয়ের অংশীদারদের মধ্যে রয়েই গেছে। ২৭ দেশের ইউরোপীয় ইউনিয়নের চীনের সঙ্গে ঘাটতি দিনে ১.১ বিলিয়ন ডলারের (৯৮১.২ মিলিয়ন ইউরো) বেশি, আর বছরের প্রথম নয় মাসে ইইউতে চীনা রপ্তানি বেড়েছে ১৬ শতাংশ।
কিছু সদস্য দেশ আরও কড়াকড়ি চায়, যদিও চলতি মাসে আগামী কয়েক বছরে চীনা হাইব্রিড গাড়ির আমদানি প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনার চুক্তি হয়েছে। সেই চুক্তিতে ইইউ চীনা হাইব্রিড গাড়ির আমদানি বছরে ৩ লাখ ৫০ হাজারে সীমিত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধ নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিজের বাজার প্রবেশাধিকার রক্ষা করতে পারে। আইএনজির গ্রেটার চায়না প্রধান অর্থনীতিবিদ লিন সংয়ের ভাষায়, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা ‘দ্রুত সমাধান করা কঠিন হবে’। নীতিনির্ধারকদের আরও অভিযোগ, ডলার ও ইউরোর বিপরীতে ইউয়ানের অবমূল্যায়ন উদ্বৃত্তকে আরও বাড়িয়েছে—তবে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। বেইজিং বলেছে, তারা বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত চায় না; গত শুক্রবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পান গংশেং বলেছেন, ঘাটতি ও উদ্বৃত্তের দেশগুলোর সহযোগিতা করা উচিত এবং চীন অভ্যন্তরীণ চাহিদা সম্প্রসারণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।




