কেন বারবার ভেস্তে যাচ্ছে ইরান-আমেরিকা আলোচনা: ইতিহাসের দুই ‘কমপ্লেক্সে’র বিশ্লেষণ
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একাধিক আলোচনা-উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র একটি — ১৮ জুন ইসলামাবাদে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক — চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল, কিন্তু সেটিও কয়েক দিনের মধ্যে ভেঙে পড়ে। আল জাজিরায় প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি বিষয়ক এক জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক যুক্তি দিয়েছেন, এই ব্যর্থতার কারণ চুক্তির খুঁটিনাটি বিধান নয় — বরং একটি ‘সিনড্রোম’, যা বহু বছর ধরে দুই দেশের সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে মানসিক সিনড্রোম তৈরি হতে পারে গভীর সংকটের ফলে, যা রাজনৈতিক চেতনা ও স্মৃতিতে ছাপ ফেলে এবং দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা ও আলোচনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ইরান-আমেরিকার ক্ষেত্রে এই সিনড্রোম দুটি ‘কমপ্লেক্স’ নিয়ে গঠিত — একটি ওয়াশিংটনের, যার উৎস ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস অবরোধ; আরেকটি তেহরানের, যার উৎস যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক শত্রুতা এবং ২০১৮ সালে ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে ওয়াশিংটনের সরে আসা।
দুই দেশের বিচ্ছেদের শিকড় ১৯৫৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত যায়, যখন মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের সরকার উৎখাতে সহায়তা করে — মোসাদ্দেক ১৯৫১ সালে তেলশিল্প জাতীয়করণ করেছিলেন। তখন থেকেই ইরানি চেতনায় ধারণা গেঁথে যায় যে ওয়াশিংটন তেহরানে স্বাধীন সরকার মেনে নেয় না এবং স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে তা ভেঙে দিতে প্রস্তুত থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৯ সালের অক্টোবরে জনগণের হাতে উৎখাত হওয়া শাহ রেজা পাহলভিকে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তকে বিপ্লবী তেহরান দ্বিতীয় অভ্যুত্থানের পূর্বাভাস হিসেবে পড়েছিল। ওই বছরের ৪ নভেম্বর ইরানি শিক্ষার্থীরা মার্কিন দূতাবাস দখল করে ৫২ জন আমেরিকানকে ৪৪৪ দিন জিম্মি রাখে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয় এবং আজ পর্যন্ত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ঘটনাটিকে ইরানি বয়ানে বিপ্লবের প্রতিরক্ষা হিসেবে দেখানো হলেও আমেরিকান চেতনায় এটি ইরানের একটি চিত্র প্রতিষ্ঠা করে — এমন একটি রাষ্ট্র, যা আন্তর্জাতিক নিয়ম মানে না, যার কথায় ভরসা করা যায় না এবং যার আচরণকে পুরস্কৃত করা উচিত নয়। বিশ্লেষকের মতে, এই ‘দূতাবাস অবরোধ কমপ্লেক্স’ একটি অনানুষ্ঠানিক নিয়ম তৈরি করেছে মার্কিন সিদ্ধান্ত-গ্রহণে: ইরানকে আগে ছাড় দিতে হবে এবং সেই ছাড় যাচাই হতে হবে, তারপরই সে কিছু পাবে।
ইরানি কমপ্লেক্সের শিকড়ও একই ইতিহাসে, তবে তা চূড়ায় পৌঁছায় ২০১৮ সালের মে মাসে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) থেকে সরে আসেন — যদিও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) নিশ্চিত করেছিল যে তেহরান চুক্তি মেনে চলছে। মাত্র দুই সপ্তাহ পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও নতুন চুক্তির জন্য ১২টি দাবি ঘোষণা করেন, যার মাত্র চারটি পারমাণবিক ফাইলের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল; সাতটি ছিল লেবানন, ফিলিস্তিন, ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া, আফগানিস্তান ও উপসাগরে ইরানের আঞ্চলিক আচরণ নিয়ে। অর্থাৎ ওয়াশিংটন শুধু বিদ্যমান চুক্তিই বাতিল করেনি, ভবিষ্যৎ চুক্তির শর্তের সিলিংও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
গিঁট আরও গভীর হয় ২০২৫ সালের জুনে, যখন ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নিয়ে ফোরদো, নাতানজ ও ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় — এমন এক সময়ে, যখন মাসকাটে পরোক্ষ আলোচনার নতুন দফা নির্ধারিত ছিল। এরপর চলতি যুদ্ধে ইসরায়েলের পাশাপাশি ওয়াশিংটনের অংশগ্রহণে তা চরমে পৌঁছায়। ফলে ইরানি চেতনায় ধারণা পোক্ত হয় যে মার্কিন স্বাক্ষর কোনো গ্যারান্টি দেয় না, প্রশাসন বদলালেই যেকোনো চুক্তি উল্টে যেতে পারে, এমনকি আলোচনা নিজেই যুদ্ধের বিকল্প না হয়ে যুদ্ধের আড়াল হতে পারে। এর অনানুষ্ঠানিক নিয়ম: বাধ্যতামূলক গ্যারান্টি ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নয়, চাপ না উঠলে কোনো ছাড় নয়।
ফলে দুই কমপ্লেক্স দাঁড়িয়ে আছে বিপরীত মেরুতে — প্রথমটি চায় মার্কিন প্রতিদানের আগে ইরানি পদক্ষেপ, দ্বিতীয়টি চায় ইরানি পদক্ষেপের আগে মার্কিন গ্যারান্টি। সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো পড়লেই দেখা যায়, প্রতিটি মার্কিন প্রস্তাবে দূতাবাস অবরোধ কমপ্লেক্সের ছাপ রয়েছে। মার্চের ১৫ দফা পরিকল্পনায় নাতানজ, ইসফাহান ও ফোরদো ভেঙে ফেলা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি স্থগিত এবং মিত্রদের ত্যাগের বিনিময়ে পরে নিষেধাজ্ঞা তোলার প্রতিশ্রুতি ছিল। মে মাসে হোয়াইট হাউসের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের খসড়ায় ইরানের জব্দ তহবিল মুক্তির সঙ্গে আগে সমৃদ্ধকরণ স্থগিতের শর্ত যুক্ত ছিল। সেপ্টেম্বরের মার্কিন জবাবেও আলোচনার পুরো সময়জুড়ে সমৃদ্ধকরণ স্থগিত ও পরিদর্শকদের প্রবেশের শর্ত ছিল।
তেহরানের উদ্যোগগুলোতেও জেসিপিওএ প্রত্যাহার কমপ্লেক্সের ছাপ স্থির। মার্চের শেষের পাঁচ দফা জবাবে যুদ্ধ পুনরাবৃত্তি না হওয়ার গ্যারান্টি চাওয়া হয়; এপ্রিলের ১০ দফায় চুক্তিকে উল্টে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাব চাওয়া হয়; মে মাসের ১৪ দফায় ইসরায়েলকেও অন্তর্ভুক্ত করে অনাক্রমণ প্রতিশ্রুতি চাওয়া হয়। আর গত মাসের তেহরানের সাত দিনের পরিকল্পনায় ষষ্ঠ দিনে হরমুজ প্রণালি খোলা এবং সপ্তম দিনে পারমাণবিক আলোচনা শুরুর আগে নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ-অবরোধ তোলার শর্ত ছিল।
বিশ্লেষকের মতে, এসব উদ্যোগ আসলে দুটি কমপ্লেক্সের মধ্যে সংলাপ — প্রতিটি পক্ষই নিজের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে খসড়া তৈরি করছে, অপর পক্ষের দিকে অর্ধেক পথ এগিয়ে যাওয়ার জন্য নয়। এ কারণেই হয়তো বিষয়বস্তুর ব্যবধান কমেছে, কিন্তু আস্থার ব্যবধান কমেনি।
ইসলামাবাদ সমঝোতাকে তিনি এই নিয়মের ব্যতিক্রম হিসেবে দেখেন — এটি ছিল নিষ্পত্তির সবচেয়ে কাছের মুহূর্ত, কারণ এটি দুই পক্ষের মূল উদ্বেগকেই আশ্বস্ত করার জন্য তৈরি হয়েছিল। ওয়াশিংটনকে আশ্বস্ত করতে এতে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত পাতলা করার কথা ছিল এবং নিষেধাজ্ঞা তোলা ও তহবিল মুক্তিকে ইরানি বাস্তবায়নের শর্তাধীন করা হয়েছিল। তেহরানকে আশ্বস্ত করতে ছিল যুদ্ধ বন্ধ, পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা এবং চূড়ান্ত চুক্তিতে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি পুরো লেখা থেকে অনুপস্থিত ছিল।
কিন্তু এই চুক্তি টেকেনি। লেবাননে যুদ্ধবিরতির অনুপস্থিতির কারণে তেহরান জেনেভা দফায় অংশগ্রহণ স্থগিত করে — মার্চ থেকে প্রতিটি ইরানি উদ্যোগেই লেবানন-প্রসঙ্গ স্থির দাবি ছিল। ইরানি পাঠে, ওয়াশিংটনের ইসরায়েলকে সংযত করতে না পারাটা নিশ্চিত করে যে মার্কিন স্বাক্ষরই যথেষ্ট নয়; সঙ্গে সঙ্গে জেসিপিওএ প্রত্যাহার কমপ্লেক্স সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং দুই পক্ষ ফিরে যায় শুরুর জায়গায়।
সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ বিরোধটি বিষয়বস্তু থেকে সুনির্দিষ্টভাবে ধাপের ক্রমে সরে গেছে বলে জানা গেছে। এখন তা বিষয়ের চেয়ে পদক্ষেপের ক্রম নিয়ে, আর লক্ষ্য হয়ে উঠেছে জুনের সমঝোতার একটি উন্নত সংস্করণে ফেরা। এখানেই দুই কমপ্লেক্স সবচেয়ে স্পষ্ট আকারে দেখা যায় — ওয়াশিংটন চায় আগে হরমুজ প্রণালি খোলা ও সমৃদ্ধকরণ স্থগিত হোক, কারণ সে ইরানকে বিশ্বাস করে না; তেহরান চায় আগে নৌ-অবরোধ উঠুক, কারণ সে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না।
২০১৮ সালের পম্পেও-শর্তের সঙ্গে ২০২৬ সালের জুন সমঝোতার তুলনা করলে দেখা যায়, মার্কিন দাবি ইরানের আঞ্চলিক ভূমিকা পুনঃসংজ্ঞায়িত করা থেকে পিছু হটে পারমাণবিক ফাইল ও হরমুজ প্রণালিতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে; আর ইরানি দাবি ওয়াশিংটনের ক্ষতিপূরণ থেকে অন্য পক্ষের অর্থায়নে শর্তসাপেক্ষ বিনিয়োগ তহবিলে সরে এসেছে। অর্থাৎ বিষয়গত ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে — আট বছর আগে যা অকল্পনীয় ছিল।
তবে দুই কমপ্লেক্স কমেনি; যুদ্ধের কারণে তা আরও গভীর হয়ে থাকতে পারে। প্রতিটি কমপ্লেক্স অন্যটিকে পুষ্ট করে, এবং একসঙ্গে তারা একক সিনড্রোমে পরিণত হয়েছে — কূটনৈতিক অচলাবস্থা ক্ষণস্থায়ী অবস্থা থেকে স্থিতিশীল কাঠামোয় রূপ নিয়েছে। বিশ্লেষকের উপসংহার: ধাপের ক্রমের যেকোনো নতুন সূত্র, যত নিখুঁতই হোক, এই অচলাবস্থা ভাঙতে পারবে না, যদি না তা একই সঙ্গে দুটি কমপ্লেক্সকেই মোকাবিলা করে — যার জন্য দরকার এমন তৃতীয় পক্ষ, যে একই সঙ্গে পদক্ষেপ ও প্রতিপদক্ষেপ দুটোরই গ্যারান্টি দিতে পারে। নিবন্ধটির মতামত লেখকের নিজস্ব।
