রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
সর্বশেষ হালনাগাদ: সকাল ১০:৪০
প্রচ্ছদ › আন্তর্জাতিক › খবর
আন্তর্জাতিক

সুদানে খাবার না ওষুধ—দীর্ঘস্থায়ী রোগীদের সামনে কঠিন পছন্দের জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক • রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ • সকাল ৯:২২ • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

সুদানে গৃহযুদ্ধের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত মানুষের কাছে প্রতিদিনের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—খাবার কিনবেন, নাকি ওষুধ? সেনাবাহিনী ও আধা সামরিক র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের মধ্যে সাড়ে তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে আয় কমেছে, ওষুধের দাম বেড়েছে, আর চিকিৎসা পাওয়াই হয়ে উঠেছে প্রতিদিনের সংগ্রাম।

৪৮ বছর বয়সী হাসানাত আল-রশিদ ১৫ বছর ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছেন। ২০২৩ সালের এপ্রিলে যুদ্ধ শুরু হলে তিনি খার্তুম নর্থের হাজ ইউসুফের বাড়ি থেকে পালিয়ে খার্তুম রাজ্যের উম্ম দাও বানে যান। বাস্তুচ্যুত জীবনে তিনি টানা কয়েক দিন ওষুধ ছাড়া ছিলেন এবং বাধ্য হয়ে নিজের অবস্থার জন্য অনুপযুক্ত খাবার, যেমন ঐতিহ্যবাহী সুদানি পোরিজ আসিদা, খেয়েছেন।

ডায়াবেটিসের জটিলতায় তার পায়ে গুরুতর সংক্রমণ হলে দুবার অস্ত্রোপচার করতে হয়। চিকিৎসার খোঁজে তিনি খার্তুমের দক্ষিণে গেজিরা রাজ্যের রুফা, ওয়াদ মাদানি ও আল-হাসাহিসার হাসপাতালে ঘুরেছেন। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে লড়াই সেসব এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তিনি আবার পালিয়ে লোহিত সাগরের শহর পোর্ট সুদানে পৌঁছান, যেখানে যুদ্ধের প্রভাব তুলনামূলক কম ছিল।

এখন তার অবস্থা এমন যে প্রতিদিন ইনসুলিন নিতে হয়। চিকিৎসক তাকে ইনসুলিন পেন ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন—মাসে এক বা দুটি লাগবে, দাম ৭০ হাজার সুদানি পাউন্ড, প্রায় ৮ ডলার। কিন্তু একসঙ্গে সেই টাকা জোগাড় করা তার পক্ষে সম্ভব নয়, তাই তিনি সস্তা শিশির ইনসুলিন নেন, যার দাম ১৭ হাজার পাউন্ড, প্রায় ১ দশমিক ৮০ ডলার।

তবে শিশির ইনসুলিনের লুকানো খরচ আরও বড়। ফ্রিজ না থাকায় ওষুধ ঠান্ডা রাখতে তাকে প্রতিদিন বরফ কিনতে হয়—মাসে খরচ ১ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ড, প্রায় ২০ ডলার। তিনি বলেন, ওষুধটি এক মাস বা তার কম সময় চলে, কিন্তু সংরক্ষণই তার বড় চ্যালেঞ্জ। এর পাশাপাশি ডায়াবেটিসের জটিলতা সামলাতে নিয়মিত ব্যথানাশক ও ভিটামিনও লাগে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ সুদানের আয়ের মাত্রাকে ১৯৯০-এর দশকের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। ফলে হাসানাতের মতো রোগীদের পক্ষে প্রয়োজনীয় ওষুধের খরচ জোগানো ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে—রক্তে শর্করার মাত্রা অনুযায়ী ডোজ বদলালেও টাকার জোগান বদলায় না।

পোর্ট সুদান হাসপাতালের আরেক রোগী ৭৫ বছর বয়সী ফাতিমা আদম। উচ্চ রক্তচাপ ও থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন তিনি, উচ্চ রক্তচাপ এখন তার হৃৎপিণ্ডকেও আক্রান্ত করেছে। অসুস্থতার কারণে তিনি নিজে কথা বলতে না পারায় তার মেয়ে আয়েশা জানান, যুদ্ধের আগে জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা তহবিল থেকে তিনি ওষুধ পেতেন—নিজে দিতেন খরচের এক-চতুর্থাংশ, বাকিটা দিত তহবিল। যুদ্ধে অর্থনীতি ভেঙে পড়ার পর সেই সুবিধায় তার ওষুধ আর মেলে না।

ফাতিমা ছয় ধরনের ওষুধ খান, সঙ্গে থাইরয়েডের ওষুধ। তার চিকিৎসা ও পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব দিনমজুর ছেলের ওপর, যার নির্দিষ্ট আয় নেই—প্রতিদিন বাজারে কাজ খুঁজতে যান, কখনো খালি হাতে ফেরেন। আয়েশা বলেন, ভাই কাজ পেলে এক মাসের ওষুধ কেনা হয়, না পেলে অল্প করে কিনে অনিয়মিতভাবে খাওয়াতে হয়। কয়েক দিন আগে মায়ের এক মাসের ওষুধ কিনতে তাদের খরচ হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড, প্রায় ১৭ দশমিক ৮০ ডলার।

ক্ষতির পরিমাণ শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়। জাতীয় চিকিৎসা সরবরাহ তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে ওষুধের মজুত, অবকাঠামো ও পরিবহন বহরে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। জাতীয় ওষুধ ও বিষ বোর্ডের হিসাবে, সংঘাতে বন্ধ হয়ে যাওয়া খার্তুমের ৩০টি ওষুধ কারখানার মধ্যে মাত্র আটটি আবার চালু হয়েছে। ফলে আমদানি করা ওষুধের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, আর সুদানি পাউন্ডের দরপতনে সেই ওষুধের দাম আরও বেড়েছে।

পোর্ট সুদানের ফার্মাসিস্ট হোসাম আল-নাইম বলেন, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের নিয়মিত ব্যথানাশক ও ভিটামিন লাগে। ওষুধের বেড়ে যাওয়া দাম শুনে রোগীদের মুখের ভাব দেখে তিনি গভীরভাবে দুঃখ পান বলে জানান। মুদ্রার পতন ফার্মাসিস্টদের জন্যও বিপদ ডেকেছে—যুদ্ধের আগে এক ডলার ছিল প্রায় ৬০০ পাউন্ড, এখন কালোবাজারে তা ৯ হাজার ৩০০ পাউন্ড। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ঠান্ডা-জ্বরের এক পাতা ট্যাবলেট তিনি ৬ হাজার পাউন্ডে বিক্রি করতেন, নতুন মজুত কিনতে গিয়ে দেখেন সরবরাহকারীর দামই ৬ হাজার—লাভ তো দূরের কথা, দোকানের খরচও ওঠে না।

উত্তর কর্দোফানের রাজধানী এল-ওবেইদে থাকেন ৫৮ বছর বয়সী হুদা মাহমুদ, ১২ বছরের বেশি সময় ধরে হৃদরোগে আক্রান্ত। তিনি পাঁচ ধরনের ওষুধ খান। একসময় ওষুধ না পেয়ে তাকে ওয়াদ মাদানি, সেন্নার বা পোর্ট সুদানের মানুষের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করতে হয়েছে, তখন মাসে খরচ হতো ৩ লাখ পাউন্ড, প্রায় ৩৩ দশমিক ৩০ ডলার। প্রতিটি বড়ি খাওয়ার নির্দিষ্ট সময় মেনে চলতে হয়—একটি খাওয়ার আগে, আরেকটি পরে; ভুলে গেলেই হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় বলে তিনি জানান।

মার্চে হুদাকে এল-ওবেইদ থেকে ওমদুরমানে যেতে হয়েছিল। এখন বাড়ি ফিরে তার নিয়মিত ওষুধের মাসিক খরচ ১ লাখ ৫১ হাজার পাউন্ড, প্রায় ১৬ দশমিক ৮০ ডলার, যা বহন করা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তার সবচেয়ে বড় ভয় ওষুধ ফুরিয়ে যাওয়া বা পরের জোগান কিনতে না পারা, কারণ তাতে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি তৈরি হবে। তিনি বলেন, একসময় পুরো সংসারের দায়িত্ব ছিল তার ওপর, এখন নিজেরই সাহায্য লাগে—নিজেকে পরিবারের বোঝা মনে হয়।

এই তিন নারীর গল্প সুদানের অসংখ্য দীর্ঘস্থায়ী রোগীর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ না থাকায় ওষুধের সরবরাহ, দাম ও আয়—তিন দিক থেকেই চাপ বাড়ছে। তাদের জন্য পরের মাসের ওষুধ জোগাড় হয় কি না, সেটাই এখন জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিভাগের আরও খবর

আন্তর্জাতিকসকাল ১০:৪৪ • ১ মিনিটে পড়ুন

ভারতে মন্দিরের সামনে ট্রাকচাপায় ১২ পুণ্যার্থী নিহত

ভারতের মধ্যপ্রদেশে মন্দিরের কাছে একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুণ্যার্থীদের ওপর উঠে গেলে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন।…

আন্তর্জাতিকসকাল ৯:১৬ • ৪ মিনিটে পড়ুন

ইয়েমেনে নানা ফ্রন্টে তীব্র লড়াই, তাইজে আটকে পড়া হাসপাতালে জ্বালানি মাত্র চার দিনের

ইয়েমেনে সরকারি বাহিনী ও হুথি যোদ্ধাদের মধ্যে লড়াই একাধিক ফ্রন্টে তীব্র আকার নিয়েছে। দুই পক্ষেরই হতাহতের খবর আসছে, আর এর মধ্যে গভীরতর হচ্ছে দেশটির ম…

আন্তর্জাতিকসকাল ৭:৩২ • ৮ মিনিটে পড়ুন

কেন বারবার ভেস্তে যাচ্ছে ইরান-আমেরিকা আলোচনা: ইতিহাসের দুই ‘কমপ্লেক্সে’র বিশ্লেষণ

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একাধিক আলোচনা-উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র একটি — ১৮ জুন ইসলামাবাদে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক —…

আন্তর্জাতিকসকাল ৭:০৫ • ৮ মিনিটে পড়ুন

ইউরোপের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কে গভীর ফাটল, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে কি বদল আসবে

একসময় ইউরোপের সঙ্গে ইসরায়েলের বন্ধুত্ব ছিল কূটনীতির বাইরেও বিস্তৃত। ইসরায়েল ইউরোপে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলত, ইউরোভিশনে অংশ নিত, ইউরোপীয় সরকারগুলোর স…