বিশ্বের শীর্ষ ১০ ব্যাংকের পাঁচটিই চীনের, সম্পদে টানা ১৩ বছর শীর্ষে আইসিবিসি
বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাতে মোট সম্পদের বিচারে চীনের আধিপত্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকার প্রথম চারটি স্থানই চীনা ব্যাংকগুলোর দখলে, আর সব মিলিয়ে শীর্ষ দশে জায়গা করে নিয়েছে দেশটির পাঁচটি ব্যাংক।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এই তালিকায় বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাংক হিসেবে টানা ১৩তম বছরের মতো প্রথম অবস্থান ধরে রেখেছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না, সংক্ষেপে আইসিবিসি। ব্যাংকটির মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৬৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ৭ দশমিক ৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
বিপুল সম্পদ, বিস্তৃত কার্যক্রম এবং চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে শক্তিশালী অবস্থানের কারণেই আইসিবিসি দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাতে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বলে তালিকার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অ্যাগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না, যার মোট সম্পদ ৬ দশমিক ৯৭ ট্রিলিয়ন ডলার। তৃতীয় স্থানে থাকা চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাংক করপোরেশনের সম্পদ ৬ দশমিক ৫২ ট্রিলিয়ন ডলার, আর ৫ দশমিক ৪৮ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ব্যাংক অব চায়না। অর্থাৎ সম্পদের বিচারে বিশ্বের শীর্ষ চারটি ব্যাংকই চীনের।
শীর্ষ দশের শেষ স্থানটিও গেছে চীনেরই আরেক ব্যাংকের কাছে। দশম অবস্থানে থাকা পোস্টাল সেভিংস ব্যাংক অব চায়নার মোট সম্পদ ২ দশমিক ৬৭ ট্রিলিয়ন ডলার। ফলে শীর্ষ তালিকায় চীনের পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত উপস্থিতি দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থার ব্যাপক আকার ও বৈশ্বিক গুরুত্বকে তুলে ধরছে।
চীনের বাইরে বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাংক হিসেবে তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জেপি মরগান চেজ অ্যান্ড কোম্পানি, যার মোট সম্পদ ৪ দশমিক ৪৩ ট্রিলিয়ন ডলার। চীনের শীর্ষ চার ব্যাংকের তুলনায় সম্পদের পরিমাণ কম হলেও বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে ব্যাংকটির প্রভাব উল্লেখযোগ্য, আর শেয়ারবাজারের মূলধন বা মার্কেট ক্যাপিটালাইজেশনের বিচারে জেপি মরগান বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ব্যাংক হিসেবেও নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আরেক বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক অব আমেরিকা রয়েছে তালিকার ষষ্ঠ স্থানে, মোট সম্পদ ৩ দশমিক ৪১ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির বৃহৎ ভোক্তা ব্যাংকিং কার্যক্রম, করপোরেট আর্থিক সেবা এবং বিনিয়োগ ব্যাংকিং খাতে উপস্থিতি প্রতিষ্ঠানটিকে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ করে তুলেছে।
ইউরোপের ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবার শীর্ষে উঠে এসেছে ফ্রান্সের বিএনপি পরিবা। ৩ দশমিক ২৮ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে ব্যাংকটি বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে এবং যুক্তরাজ্যের এইচএসবিসিকে পেছনে ফেলেছে। এইচএসবিসি হোল্ডিংস ৩ দশমিক ২১ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে রয়েছে অষ্টম স্থানে, আর ফ্রান্সের আরেক ব্যাংক ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল ৩ দশমিক ১৪ ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে নবম অবস্থানে আছে।
ফলে ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যেও ফরাসি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে — বিএনপি পরিবা ও ক্রেডিট অ্যাগ্রিকোল, দুটি ব্যাংকই শীর্ষ দশে জায়গা করে নিয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনা ব্যাংকগুলোর বিপুল সম্পদের পেছনে রয়েছে দেশটির বিশাল অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়, বৃহৎ অর্থনীতি, অবকাঠামো খাতে সরকারি বিনিয়োগ এবং বন্ড ও ঋণবাজারের ভূমিকা। দেশটির ব্যাংকগুলো শিল্প, বাণিজ্য, আবাসন, অবকাঠামো ও সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়নের মাধ্যমে বড় ধরনের সম্পদভিত্তি গড়ে তুলেছে; বিশাল জনসংখ্যা ও অভ্যন্তরীণ বাজারও আমানত সংগ্রহ এবং ঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছে।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, মোট সম্পদের আকার বড় হলেই কোনো ব্যাংকের মুনাফা, সম্পদের গুণগত মান কিংবা আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা একই অনুপাতে শক্তিশালী — এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এসব মূল্যায়নে খেলাপি ঋণ, মূলধন পর্যাপ্ততা, মুনাফা এবং তারল্যের মতো সূচকও বিবেচনা করতে হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ব্যাংকগুলোর শক্তির অন্যতম উৎস বিনিয়োগ ব্যাংকিং, পুঁজিবাজার, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, করপোরেট অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন। ইউরোপের বড় ব্যাংকগুলোও বহুজাতিক ব্যবসা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন, করপোরেট ব্যাংকিং এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সব মিলিয়ে, মোট সম্পদের বিচারে বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাংকগুলোর এই তালিকা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এশিয়ার, বিশেষ করে চীনের ক্রমবর্ধমান আর্থিক উপস্থিতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক শক্তি এবং ইউরোপের ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক কার্যক্রমও তাদের প্রভাব বজায় রেখেছে — তবে প্রকৃত সক্ষমতার তুলনা করতে হলে সম্পদের পাশাপাশি মুনাফা, মূলধন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বাজারমূল্যের মতো সূচকগুলোও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।






