৬০ হাজার কোটি টাকার ১৫ তহবিলে ছাড় মাত্র ২৪ শতাংশ, পড়ে আছে তিন-চতুর্থাংশ অর্থ
কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, কর্মসংস্থান তৈরি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেওয়া আর গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে গঠিত ৬০ হাজার কোটি টাকার ১৫টি বিশেষ তহবিলের অর্থ ছাড়ে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিতরণ ও ছাড়ের প্রক্রিয়ায় থাকা অর্থ মিলিয়ে অগ্রগতি মোট বরাদ্দের মাত্র ২৪ দশমিক ২০ শতাংশ।
হিসাব অনুযায়ী, এসব স্কিমের বিপরীতে এখন পর্যন্ত বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে ১১ হাজার ৯৫৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর বাইরে আরও ২ হাজার ৫৫৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ছাড়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। দুটি মিলিয়ে মোট অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৫১৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের প্রায় ৭৫ দশমিক ৮০ শতাংশ অর্থ এখনো ব্যবহার করাই সম্ভব হয়নি।
এসব তহবিল গঠিত হয়েছে পুনঃঅর্থায়ন ও প্রাক্-অর্থায়ন সুবিধার আওতায়—ব্যাংকগুলো সংশ্লিষ্ট খাতে ঋণ দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই অর্থের জোগান দেয়। ফলে তহবিলের অর্থ ছাড় না হওয়ার মানে হলো, উদ্দিষ্ট খাতের উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক পর্যায়ের সুবিধাভোগীদের কাছে প্রত্যাশিত ঋণসুবিধা পৌঁছায়নি।
তবে হাতে গোনা কয়েকটি স্কিমে ইতিবাচক চিত্রও আছে। প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে বরাদ্দের চেয়েও বেশি অর্থ বিতরণ হয়েছে—৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের বিপরীতে ছাড় হয়েছে ৬ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য গঠিত ৫০০ কোটি টাকার তহবিলের পুরোটাই বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে।
কটেজ ও মাইক্রো খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির তহবিলে ৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে আড়াই হাজার কোটি টাকা ছাড় হয়েছে। আর সিএমএসএমই খাতের চলতি মূলধন তহবিলের ৫ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে ছাড় হয়েছে ৯০৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। তবে এ দুটি খাতেও বরাদ্দের বড় অংশই এখনো অব্যবহৃত।
সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্র সবচেয়ে বড় তহবিলেই। বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক্-অর্থায়ন স্কিমে এককভাবে সর্বোচ্চ ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও এখন পর্যন্ত ছাড় হয়েছে মাত্র ৫৬০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা; আরও ৯২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা ছাড়ের অপেক্ষায় রয়েছে। বরাদ্দের তুলনায় এই হার অত্যন্ত কম।
একই স্থবিরতা খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও কর্মসংস্থানভিত্তিক স্কিমগুলোতেও। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও পল্লি অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে বিতরণ হয়েছে মাত্র ২৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে ছাড় হয়েছে মাত্র ৪৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ১ হাজার কোটি টাকার তহবিলের মধ্যে বিতরণ হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। নতুন উদ্যোগ বা স্টার্টআপ খাতের ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দের বিপরীতে ছাড় হয়েছে কেবল ৩২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, আর ৫ কোটি টাকা ছাড়ের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্কিমে অর্থ ছাড়ের হার এখনো শূন্যের কোটায়। ৩ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি বহুমুখীকরণ স্কিম, ১ হাজার কোটি টাকার গ্রামীণ অর্থনীতি গতিশীলকরণ তহবিল এবং ২ হাজার কোটি টাকার হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রপ্তানি খাতের তহবিলের বিপরীতে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো অর্থই বিতরণ করা যায়নি।
পরিবেশবান্ধব শিল্প ও গ্রিন ফ্যাক্টরি খাতের ১ হাজার কোটি টাকার তহবিলের পুরোটাই অবণ্টিত থাকলেও ৫২৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ছাড়ের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। চামড়াজাত ও পাদুকা শিল্পের ২ হাজার কোটি টাকার স্কিমে ছাড় হয়েছে ৯৮ কোটি টাকা। আর বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ১ হাজার কোটি টাকার স্কিমের পুরো বরাদ্দই ছাড়ের অপেক্ষায় পড়ে আছে।
সামগ্রিকভাবে মোট তহবিলের এক-চতুর্থাংশেরও কম অগ্রগতি হওয়ায় অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। যে উদ্দেশ্যে—কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান আর গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করতে—তহবিলগুলো গঠন করা হয়েছিল, অর্থ মাঠে না গেলে সেই উদ্দেশ্য কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
এখন দেখার বিষয়, আগামী মাসগুলোতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের গতি বাড়ে কি না। ছাড়ের প্রক্রিয়ায় থাকা অর্থ দ্রুত পৌঁছে গেলে আর শূন্যে থাকা তিনটি স্কিমে বিতরণ শুরু হলে সার্বিক চিত্র কিছুটা বদলাতে পারে—তবে বর্তমান গতি ধরে রাখলে বরাদ্দের বড় অংশই অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।





