মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের একটাই হিসাব: পরিবারের খরচ চলবে তো?
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। ৩ নভেম্বরের এই ভোটে নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে। আর ভোটারদের কথায় এবারের নির্বাচনের একটাই কেন্দ্রীয় ইস্যু—পরিবারের খরচ চালানোর হিসাব।
আলাস্কা, আইওয়া, নিউ হ্যাম্পশায়ার ও মেইন—এই চার অঙ্গরাজ্যের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, জ্বালানির দাম, গরম রাখার খরচ আর দৈনন্দিন ব্যয় নিয়ে হতাশা প্রায় সব জায়গায়। অনেকের কাছেই এই ভোট কার্যত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাজের মূল্যায়ন।
আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে স্বাস্থ্য প্রশাসনে কর্মরত অবসরপ্রাপ্ত সেনা মেজর জশ ইয়র্ক তিনবার ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যে, রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকায় জ্বালানির দাম গ্যালনপ্রতি ২৪ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। সম্প্রতি গ্রামীণ আলাস্কায় গিয়ে তাঁকে গ্যালনে ৮ দশমিক ৯৯ ডলার দিতে হয়েছে।
ইয়র্ক এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে—যে পথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় পঞ্চমাংশ পরিবহন হতো।
ট্রাম্প এই সপ্তাহে মহাদেশীয় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে গিয়ে আলাস্কায় রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সালিভানের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। সালিভানের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান মেরি পেল্টোলা। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের আশা করা চারটি আসনের একটি এটি।
অ্যাঙ্কোরেজ থেকে ৪৫ মাইল উত্তরে ওয়াসিলায় এক সমাবেশে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে এবং যুদ্ধ শেষ হলেই দাম কমবে। প্রতিপক্ষরা নির্বাচনকে ‘সাধ্যের মধ্যে জীবনযাপন’ ইস্যুতে পরিণত করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, সমস্যাটি প্রতিপক্ষরাই তৈরি করেছিল এবং তাঁর প্রশাসন তা অনেকটাই কমিয়ে এনেছে।
তবে ভোটারদের মনোভাবের চিত্র ভিন্ন। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, ৫২ শতাংশ আমেরিকান ট্রাম্পের কাজের প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৪ সালে ট্রাম্প আলাস্কায় ১৩ পয়েন্টের ব্যবধানে জিতলেও এবার সেখানকার সিনেট লড়াইকে টস-আপ বা অনিশ্চিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের সমর্থক ও ইরান যুদ্ধের পক্ষে থাকা সালিভান নিজেও স্বীকার করেছেন, সংঘাতের কারণে দাম বাড়ছে এবং যুদ্ধ ‘শিগগিরই’ শেষ হওয়া উচিত। ফেয়ারব্যাংকসের এক ভোটার জানিয়েছেন, তাঁর বাড়ি গরম রাখার খরচ এখন বন্ধকির কিস্তিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সাংবাদিক মার্থা র্যাডাটজের কাছে ইয়র্ক বলেন, তিনি ট্রাম্পকে ভোট দিলেও অর্থনীতি পরিচালনা, ইরান যুদ্ধ এবং দেশের সামগ্রিক দিক—সব ক্ষেত্রেই প্রেসিডেন্টের ওপর অসন্তুষ্ট। সিদ্ধান্তহীন এই ভোটারের শেষ কথা ছিল, ‘আমাকে দেখতে হবে কোনটা আমার পরিবারের জন্য ভালো, আমার সন্তানদের জন্য ভালো।’
আইওয়াতেও একই সুর। গবাদিপশু খামারি ড্যান পেডারসন, তিনিও তিনবারের ট্রাম্প ভোটার, জানান তাঁদের ৩ হাজার ৫০০ গ্যালনের জ্বালানি ট্যাংক ভরতে এখন ২০ হাজার ডলার লাগে, যেখানে এক বছর আগে লাগত প্রায় ১২ হাজার ডলার। পশু পরিবহন থেকে পিকআপ-ট্রাক—সবকিছুতেই এই ব্যয়ের ধাক্কা লাগছে বলে তাঁর মন্তব্য।
পেডারসনের ভাষ্যে, তাঁর ‘কট্টর রিপাবলিকান বন্ধুদের’ মধ্যেও ট্রাম্পকে নিয়ে দ্বিধা দেখা দিয়েছে। আইওয়ার সিনেট আসনের রিপাবলিকান প্রার্থী রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যাশলি হিনসন প্রেসিডেন্টের অবস্থান থেকে সরে এসে ইরান যুদ্ধ শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ডিজেলের দাম কমাতে ট্রাম্প গত সপ্তাহে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপে একটি ‘ডিজেল চুক্তির’ কথাও ঘোষণা করেন, যার আওতায় নিষেধাজ্ঞায় আটকে থাকা রুশ ডিজেলের সরবরাহ খুলে দেওয়ার বিষয়ে দুই নেতার সম্মতির কথা বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ৩ নভেম্বরের ভোট যতই এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রার্থীর চেয়ে বড় হয়ে উঠছে পরিবারের বাজেটের হিসাব। জ্বালানি আর জীবনযাত্রার ব্যয়ই নির্ধারণ করে দিতে পারে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ।






