বেতার ভবনে ম্যুরাল নির্মাণে সাড়ে ছয় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ইনুসহ আটজনের বিরুদ্ধে দুদকের চার্জশিট
বাংলাদেশ বেতারের ভবনে আইন ও নিয়মবহির্ভূতভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল নির্মাণ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে ৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বেশি অর্থ আত্মসাৎ ও সরকারের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগে সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ আটজনের বিরুদ্ধে চার্জশিটের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
রোববার দুদক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সংস্থাটির সচিব মো. সাইদুর রহমান খান। তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের আবেদনের কথা বলে বিধিবহির্ভূতভাবে প্রকল্পের অনাবশ্যক অংশ হিসেবে ম্যুরাল নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত করে এই অর্থ অপচয় ও আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ঘটনার শুরুটা হয়েছিল একটি আবেদন থেকে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ বেতারের আগারগাঁও কেন্দ্রে শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাস্কর্য বা ম্যুরাল স্থাপনের আবেদন করা হয়। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ বেতারের তৎকালীন মহাপরিচালক তথ্য মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক অনুমোদনের সুপারিশ পাঠান।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সভাপতিত্বে এক সভায় বিষয়টি স্টিয়ারিং কমিটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তীতে প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির তৃতীয় সভায় প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়।
এরপর ২০১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি ইনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আরেকটি সভায় ‘বাংলাদেশ বেতারের শাহবাগ কমপ্লেক্স আগারগাঁও ঢাকায় স্থানান্তর, নির্মাণ ও আধুনিকায়ন’ প্রকল্পের আওতায় এই ম্যুরাল নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অর্থাৎ বেতার ভবন স্থানান্তরের মূল প্রকল্পের ভেতরেই জুড়ে দেওয়া হয় ম্যুরাল নির্মাণের কাজ।
দুদক সচিব জানান, পরবর্তীতে ২০২০ সালের ৯ ডিসেম্বর তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ব্রোঞ্জ ম্যুরালের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়। এর পর ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ১২ জুনের মধ্যে ৯টি বিলের মাধ্যমে মোট ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা উত্তোলন ও গ্রহণ করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরকারি খাতের উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন পদ্ধতির নির্দেশিকা অনুযায়ী এই ম্যুরালটি মূল প্রকল্পের অনাবশ্যক বা অপরিহার্য অংশ ছিল না। তা সত্ত্বেও আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রকল্পের আওতায় ম্যুরালটি অন্তর্ভুক্ত করেন এবং সরকারের বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি সাধন করেন।
দুদক বলছে, আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় কমিশন চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে। দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা সরকারি কর্মচারীর বিশ্বাসভঙ্গ সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে, আর দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা অসদাচরণের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের বিষয়ে প্রযোজ্য।
চার্জশিট অনুমোদনের অর্থ হলো মামলাটি এখন আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে এগোবে। আদালতে চার্জশিট দাখিলের পর অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বিচার কার্যক্রম চলবে। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী সাজা হতে পারে।
সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু জাসদের শীর্ষ নেতা এবং দীর্ঘদিনের সংসদ সদস্য ছিলেন। তাঁর মন্ত্রিত্বকালের একটি প্রকল্প ঘিরে এত বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এখন নজর থাকবে আদালতের দিকে—চার্জশিট গৃহীত হয় কি না এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় দুদক তার অনুসন্ধানের তথ্যপ্রমাণ কতটা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, সেটিই নির্ধারণ করবে মামলাটির পরিণতি।




