মানিকগঞ্জের পদ্মায় চার বছরে ইলিশ উৎপাদন কমেছে ৪৬ শতাংশ, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চলছে মা ইলিশ শিকার

মানিকগঞ্জের নিম্ন পদ্মায় গত চার বছরে ইলিশের উৎপাদন ৪৬ শতাংশের বেশি কমেছে, আর ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলা ২২ দিনের প্রজননকালীন সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও জেলার পদ্মা ও যমুনা নদীতে ডিমওয়ালা মা ইলিশ শিকার ও প্রকাশ্যে বেচাকেনা চলছে।
জেলার হরিরামপুর, দৌলতপুর ও শিবালয় উপজেলার অভয়াশ্রম এলাকায় ক্ষতিকর কারেন্ট জাল ফেলে দিন-রাত মাছ ধরা হচ্ছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে।
দৌলতপুর থেকে শিবালয়ের নয়াকান্দি পর্যন্ত নদীপারের আলোকদিয়া, চর শিবালয়, হেমগঞ্জ, বাঘুটিয়া, জাফরগঞ্জ, ডালা মালুচি ও গোয়ালিয়াসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ভোরের আলো ফোটার আগে এবং রাতে প্রকাশ্যে ইলিশ বেচাকেনা চলছে। কম দামে কেনা এই মাছ অটোরিকশায় করে শিবালয়সহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে চড়া দামে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।
শিবালয়ের কলাবাগান এলাকার মাছ বিক্রেতা সাইফুল ইসলাম জানান, মৌসুমি জেলেরা ছোট ইলিশ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় এবং ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ওজনের মাছ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করছেন। অন্য এলাকায় এনে ১ কেজি ওজনের মাছ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ছোট মাছ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ’-এর তথ্য অনুযায়ী, মানিকগঞ্জের নিম্ন পদ্মায় ইলিশ উৎপাদন চার বছরে ৪৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ, অর্থাৎ ৫৩৭ টন কমেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ১ হাজার ১৫৯ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ১১৭ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ১২২ টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৯০ টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৬২২ টনে।
পরিবেশবাদী সংগঠক নজরুল ইসলাম বলেন, নদীতে ডুবোচর সৃষ্টি, পলি জমে নাব্য হ্রাস, পানির প্রবাহ ও লবণাক্ততার পরিবর্তন, বর্জ্য দূষণ, যান্ত্রিক নৌকার উচ্চ শব্দ এবং জাটকা ও মা ইলিশ নিধনে কারেন্ট জাল ও ‘চায়না দুয়ারী’ ফাঁদের ব্যবহার এই সংকটের পেছনে দায়ী। মাছ না পেয়ে জেলার অনেক নিবন্ধিত জেলে নৌকা ও জাল বিক্রি করে রিকশা চালানো বা কৃষিকাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও তিনি জানান।
মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, পর্যাপ্ত সহায়তা ও স্পিডবোটের অভাব এবং সমন্বিত ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে তাঁদের সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে। বিশাল নদী এলাকা একবারে ঘিরে ফেলা সম্ভব না হওয়ায় প্রশাসন এক জায়গায় অভিযান চালালে অসাধু জেলেরা অন্য জায়গায় মাছ ধরা শুরু করে।
অভিযোগ উঠেছে, পেশাদার জেলেরা এই সময়ে নদীতে না নেমে কষ্টে দিন কাটালেও চরাঞ্চলের অন্তত তিন হাজার মৌসুমি জেলে অবৈধভাবে মাছ ধরায় যুক্ত রয়েছেন।
গোয়ালিয়ার মৌসুমি জেলে ফারুক হোসেন, বারেক শেখ ও আমজাদ হোসেন জানান, তাঁরা নিজস্ব সূত্রের মাধ্যমে প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের খবর রাখেন; অভিযান শুরু হলে ফোনে খবর পেয়ে সরে যান এবং প্রশাসন চলে গেলে আবার নদীতে নামেন। যেদিন মাছ কম বিক্রি হয়, সেদিন নদীপারের বাড়িগুলোর ডিপ ফ্রিজ ভাড়া নিয়ে মাছ সংরক্ষণ করা হয় এবং নিষেধাজ্ঞা শেষে বাজারে বিক্রি করা হয়। অভিযান এড়াতে আগে থেকেই অতিরিক্ত কারেন্ট জাল কিনে রাখেন তাঁরা।
নদীতে নামা জেলেরা আরও জানান, ১০০ জন জেলের মধ্যে মাত্র ১০ জনের মতো নিবন্ধিত ‘জেলে কার্ড’ থাকায় তাঁরা সরকারি সহায়তা পান না, এবং পেটের দায়েই বাধ্য হয়ে তাঁরা মাছ ধরতে নামেন।
শিবালয় উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাথী রানী নিয়োগী জানান, মা ইলিশ রক্ষায় পরিচালিত ৬৪টি অভিযানে ৩৫৪ কেজি ইলিশ এবং ৪৭ লাখ মিটার কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য পাঁচ কোটি টাকা, এবং ৩৭ জন জেলেকে জেল-জরিমানা করা হয়েছে।




