সম্প্রসারণ হচ্ছে ইস্টার্ন রিফাইনারি: ৩১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে তিন গুণ হবে তেল পরিশোধন সক্ষমতা
বিভিন্ন কারিগরি ও বাস্তবায়নগত জটিলতা সত্ত্বেও এগিয়ে চলছে চট্টগ্রামের রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প। প্রায় ৩১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন ‘ইআরএল ইউনিট-টু’ চালু হলে দেশের বার্ষিক জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা বর্তমানের তিন গুণ হবে।
একই সঙ্গে পরিশোধিত পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দেশীয় সরবরাহ বাড়বে, আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং জ্বালানি খাতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পটির জন্য সরকার প্রায় ৩১ হাজার ৫৭ কোটি টাকার অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিজস্ব অর্থায়ন ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশ বহন করবে সরকার, বাকি ৪০ শতাংশ আসবে বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে।
প্রকল্পের অনুমোদিত মেয়াদ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্মাণকাজ শেষ করে ২০৩০ সালের নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা এবং পরিশোধিত জ্বালানির চাহিদার বড় অংশ অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণের লক্ষ্যেই ইআরএল সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে রিফাইনারিটির বার্ষিক তেল পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। নতুন ইউনিট চালু হলে তা বেড়ে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হবে।
পাশাপাশি পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দেশীয় চাহিদা পূরণের সক্ষমতা বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির প্রাথমিক মৌলিক প্রকৌশল নকশা বা ফ্রন্ট-এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন (ফিড) ডকুমেন্ট তৈরির দায়িত্ব পেয়েছে ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান টেকনিপ। ১৯৬৮ সালে ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রথম ইউনিট নির্মাণেও প্রতিষ্ঠানটি যুক্ত ছিল।
বর্তমানে প্রকল্পের কাজের মান নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়ন তদারকির জন্য প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক নিয়োগের কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি কারিগরি নকশা, ক্রয় ও নির্মাণকাজ পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের মাঝামাঝি নির্মাণকাজ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় একাধিক বিদেশি প্রযুক্তি সরবরাহকারী ও লাইসেন্সদাতা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকায় কারিগরি সমন্বয় একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পে পাঁচটি বিদেশি লাইসেন্সদাতা প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নতুন করে আলোচনা ও দর-কষাকষি চলছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক নিয়োগের পর প্রকৌশল, ক্রয় ও নির্মাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করা হবে।
আধুনিকায়ন প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো জ্বালানির গুণগত মান উন্নত করা। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ইউরো-৪ মানের জ্বালানি পরিশোধন করা হয়। নতুন প্রকল্পের আওতায় নতুন ইউনিটের পাশাপাশি বিদ্যমান রিফাইনারিকেও ইউরো-৬ মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে জ্বালানিতে সালফারের পরিমাণ কমে প্রতি মিলিয়নে দুই অংশে (২ পিপিএম) নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পরিবেশদূষণ কমাতে সহায়ক হবে। বিদ্যমান প্ল্যান্টের মান উন্নয়নের ফলে কার্বন ট্রেডিংয়ের সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
নতুন ইউনিটে প্রচলিত জ্বালানি তেলের পাশাপাশি লুব অয়েল, সালফার, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও জেট ফুয়েল উৎপাদনের ব্যবস্থাও থাকবে। বর্তমানে এসব পণ্যের কিছু অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। নতুন প্ল্যান্টে উৎপাদন শুরু হলে লুব অয়েল ও সালফারের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানির প্রয়োজন কমবে। একই সঙ্গে তেল পরিশোধনের উপজাত হিসেবে এলপিজি উৎপাদন এবং দেশের জেট ফুয়েলের চাহিদার বড় অংশ স্থানীয়ভাবে পূরণের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের মাধ্যমে ১৮ থেকে ১৯ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারে। ফলে প্রকল্পটি চালু হলে একদিকে দেশের তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় কমিয়ে জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর পথ সুগম হবে।
সব মিলিয়ে, নানা জটিলতা সত্ত্বেও অগ্রগতি ধরে রাখা এই প্রকল্প বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম বড় বিনিয়োগ। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হলে ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের জ্বালানি চিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।


