চাঁদাবাজির জ্বালায় জনগণ অতিষ্ঠ, সরকারের স্বস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা নেই: প্রেস ক্লাবে জামায়াত আমির শফিকুর রহমান
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকারের দেশের মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। চাঁদাবাজির জ্বালায় জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তার ভাষ্য, এক টাকার জিনিস এখন তিন টাকায় কিনতে বাধ্য হচ্ছে মানুষ।
রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আয়োজনে ‘জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তি’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বক্তব্যজুড়ে সরকারের কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা।
দ্রব্যমূল্যের উদাহরণ টেনে জামায়াত আমির বলেন, দুই দিন আগে গণমাধ্যমে তিনি দেখেছেন, পঞ্চগড়ে চারটি লাউ নাকি এক টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উপযুক্ত দাম না পেয়ে চাষিরা মনের জ্বালায় সেগুলো খাল-বিলে ফেলে দিচ্ছেন। অথচ রাজধানীতে একটি লাউ কিনতে ৪০, ৫০ কিংবা ৬০ টাকা লাগে। তার অভিযোগ, চাঁদাবাজদের কারণেই এই বাড়তি চাপ সাধারণ ক্রেতার ওপর বসেছে।
তিনি বলেন, সরকার চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ করতে পারেনি। রাড্ডা মেডিকেল সেন্টারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর, দশকের পর দশক জনগণকে উন্মুক্ত সেবা দিয়ে আসছিল; সেটির ওপর রাতের অন্ধকারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। অপরাধের পর সংশ্লিষ্ট এমপিকে কেবল পদত্যাগ করানো হয়েছে বলে তিনি প্রশ্ন তোলেন—আইন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থাকতে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হলো না কেন? পদত্যাগের মাধ্যমেই সব শেষ হয়ে যাবে কি না, সে প্রশ্নও রাখেন তিনি। তার ভাষ্য, জনগণকে বোকা ভাবা ঠিক নয়; জনগণ সব বোঝে।
চাঁদাবাজির বিস্তার নিয়ে তিনি আরও অভিযোগ করেন, অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নিজেদের লোকেরাও তা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। বহু জায়গায় বিএনপির লোকেরা বলেন, দশকের পর দশক দল করার পর এখন নিজের কাছেই চাঁদা চাওয়া হচ্ছে—এমন মন্তব্যও তিনি বক্তব্যে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে নিজেদের লোকদের পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করতে কুণ্ঠা না করার মতো গুরুতর অভিযোগও তিনি সরকারপক্ষের দিকে তোলেন।
ডা. শফিকুর রহমানের দাবি, এভাবে দেশ চলতে পারে না। পাহাড়সম ব্যর্থতা চাপা দিতে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা এবং একটি বয়ান তৈরির চেষ্টা চলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তার প্রশ্ন, সাত মাসের সরকার কিছু ভুলত্রুটি করেছে—এমন কথা বলা হচ্ছে; কিন্তু ৭০ ভাগ মানুষের রায় এত তাড়াতাড়ি অগ্রাহ্য করা হলো কেন, সমাজের সব জায়গা এত তাড়াতাড়ি দখলে নেওয়া হলো কেন, দলীয় ক্যাডারদের প্রশাসক বানিয়ে মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হলো কেন? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এত মারাত্মক অবনতি কেন—সেই প্রশ্নও তিনি সামনে আনেন।
বক্তব্যে একজন মন্ত্রীর নাম ধরে সমালোচনা করে তিনি বলেন, সালাউদ্দিন সাহেব সব মন্ত্রণালয়ের ব্যাপারে পারদর্শী—আইন মন্ত্রণালয়, এমনকি শেষ পর্যন্ত ধর্ম মন্ত্রণালয় সম্পর্কেও; কেবল নিজের মন্ত্রণালয় দেখার সুযোগ পান না। তিনি আরও বলেন, সংসদে দাঁড়িয়ে সরকারি দলের একজন সিনিয়র সংসদ সদস্য নিজেই বলেছেন, মাদক বন্ধ হবে কীভাবে—মাদকের সবচেয়ে বড় চালান তো আসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির এলাকা দিয়ে।
দিনের বেলা ৫০টি ট্রাকে ডাকাতি হয়েছে—বিষয়টি স্পষ্ট বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার আহ্বান, জনগণকে সংবিধান সংশোধনের নামে ধোঁকা দেওয়ার পথ ছেড়ে সরকারের উচিত নিজের দায়িত্বের দিকে মনোযোগ দেওয়া; তা না হলে সরে দাঁড়ানো উচিত।
আন্দোলনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জামায়াত আমির বলেন, তাদের বার্তা স্পষ্ট—তারা কোনো দলীয় দাবি বা ১১-দলীয় জোটের কোনো দাবি নিয়ে মাঠে নামেননি; নেমেছেন জনগণের অধিকারের দাবি নিয়ে। প্রতিটি দাবিই জনগণের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই দাবি বাস্তবায়নে কর্মসূচি না করতে তাদের ওপর নানাভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গণভোটে ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। জনগণ জানিয়ে দিয়েছে, তারা অতীতের ঘুণে ধরা, বস্তাপচা রাজনীতি আর দেখতে চায় না; তারা পরিবর্তন ও সংস্কার চায়। তিনি বলেন, এর আগে প্রথম লংমার্চ হয়েছে; ভারত নিয়ে অনেক হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছিল, লংমার্চে জনগণের সাড়া নেই বলা হয়েছিল—কিন্তু সাড়া আছে কি না, জনগণই তার সাক্ষী।
বক্তব্যের শেষ দিকে তিনি বলেন, তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করে যাচ্ছেন এবং বিশৃঙ্খলায় বিশ্বাস করেন না; কেউ যেন তাদের ওপর বিশৃঙ্খলা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করেন। জনগণের অধিকারের পক্ষে লড়াইয়ের কথা বলে তিনি বলেন, তাদের নেতৃবৃন্দ কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত করেননি, তারাও করবেন না। জনগণ তাদের সঙ্গে আছে বলেও তিনি দাবি করেন।
জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের বর্ষপূর্তির এই আলোচনা সভা থেকে দেওয়া বক্তব্যে চাঁদাবাজি, দখলদারি, দ্রব্যমূল্য ও আইনশৃঙ্খলা—চারটি বিষয়ই একসঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী শিবিরের প্রধান অভিযোগ হিসেবে উঠে এলো। এখন দেখার বিষয়, সরকারপক্ষ থেকে এসব অভিযোগের জবাব কী আসে এবং মাঠের কর্মসূচি কোন দিকে এগোয়।






