ফরিদপুরের ফলিয়া বাজারে রাতের আগুনে ছাই ৯ গুদাম: পাট-পেঁয়াজ-চালে ক্ষতি প্রায় ৩ কোটি টাকা
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ফলিয়া বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পাট, পেঁয়াজ, রসুন ও চালের নয়টি গুদাম সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতে লাগা এই আগুনে প্রায় তিন কোটি টাকার মালামাল ভস্মীভূত হয়েছে বলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। এক রাতের আগুনে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে ফলিয়া বাজারের পাট ও পেঁয়াজ ব্যবসায়ী মাসুদ মন্ডলের গুদাম থেকে হঠাৎ ধোঁয়া ও আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন আশপাশের অন্য গুদাম ও দোকানে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে প্রাথমিক পর্যায়ে স্থানীয়রা কাছে ঘেঁষতেই পারেননি।
ক্ষতিগ্রস্ত গুদামগুলোর মালিকদের মধ্যে রয়েছেন হাবিবুর রহমান হাবি মন্ডল, ফিরোজ মেম্বার, মাসুদ মন্ডল, মিল্টন মোল্যা, জুয়েল মেম্বার, ইমরুল মোল্যা ও কালাম মোল্যাসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের প্রতিটি গুদামে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার পাট, পেঁয়াজ, রসুন ও চাল মজুত ছিল বলে জানা গেছে—সেই হিসাবেই মোট ক্ষতির অঙ্ক প্রায় তিন কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. কিসলু খালাসী ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তার ভাষ্য, বাজারের লোকজনের ছোটাছুটি ও চিৎকার শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে তিনি দেখেন মাসুদ মন্ডলের গুদামে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। চোখের পলকে আগুন আশপাশে ছড়িয়ে পড়ায় আট-নয়টি দোকানের সব মালামাল পুড়ে শেষ হয়ে যায়।
খবর পেয়ে আলফাডাঙ্গা ও বোয়ালমারী ফায়ার স্টেশনের মোট চারটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে চলা বারাশিয়া নদী থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি সংগ্রহ করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা স্থানীয় জনতাকে সঙ্গে নিয়ে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে গুদামগুলোতে থাকা কৃষিপণ্যের প্রায় সবই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ফিরোজ মেম্বার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, সারাদিন ব্যবসা শেষে গুদাম বন্ধ করে তিনি বাড়িতে গিয়েছিলেন। খবর পেয়ে এসে দেখেন তার সব শেষ। ধারদেনা করে পাট তুলেছিলেন বিক্রির জন্য—এখন কীভাবে এই ঋণ শোধ করবেন আর পরিবার চালাবেন, তা বুঝতে পারছেন না। সরকার বা সংশ্লিষ্টরা পাশে না দাঁড়ালে তাদের পথে বসা ছাড়া উপায় নেই বলেও তিনি বলেন।
আরেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী মাসুদ মন্ডল জানান, জমিজমা বিক্রি করে এবং চড়া সুদে ঋণ নিয়ে পাট, পেঁয়াজ ও রসুন কিনে তিনি গুদামে রেখেছিলেন। তার একারই প্রায় ৫০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এই বিশাল ক্ষতি কীভাবে কাটিয়ে উঠবেন, সেই চিন্তায় তিনি দিশেহারা।
আগুনের কারণ সম্পর্কে জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক সোহেল রানা বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা থেকে চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। প্রায় নয়টি দোকানে আগুন লেগে পাট, পেঁয়াজ ও চালসহ নানা মালামাল পুড়ে নষ্ট হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তবে ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ও কারণ তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো যাবে বলে তিনি জানান।
ফলিয়া বাজার এলাকার কৃষিভিত্তিক বাণিজ্যের পরিচিত কেন্দ্র। পাট, পেঁয়াজ, রসুন ও চালের গুদামগুলোকে ঘিরেই এখানকার অনেক পরিবারের জীবিকা গড়ে উঠেছে। মৌসুমের মজুত পণ্য এক রাতে পুড়ে যাওয়ায় ক্ষতির আঘাত শুধু নয়জন ব্যবসায়ীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না—এর প্রভাব পড়বে স্থানীয় সরবরাহ ও বাজারেও।
আকস্মিক এই অগ্নিকাণ্ডে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া ব্যবসায়ীরা দ্রুত সরকারিভাবে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, দ্রুত সরকারি প্রণোদনা ও সহযোগিতা না পেলে এই অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক ব্যবসা ও ব্যবসায়ীরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না।
এখন সবার অপেক্ষা ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে। আগুনের কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া এবং ক্ষতির তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পরই বোঝা যাবে, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সহায়তার কোনো ব্যবস্থা হয় কি না।






