টঙ্গীর মাদ্রাসার ঘটনায় অ্যাটর্নি জেনারেল: কেউ নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারেন না, বিচার হবে আইনি প্রক্রিয়ায়
টঙ্গীর একটি মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলমান তর্ক-বিতর্কের মধ্যে মতামত দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি বলেছেন, অপরাধের অভিযোগ থাকলে তার বিচার আইনি প্রক্রিয়ায় হতে হবে; কেউ নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারেন না।
রোববার (২৫ অক্টোবর) নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন ও আইনি প্রতিকারের ব্যবস্থা রয়েছে। তার ভাষায়, পৃথিবীতে খুব কম দেশ আছে, যেখানে এত বেশি আইন আছে; বাংলাদেশে এমন কোনো পরিস্থিতি নেই, যা আইন দিয়ে মোকাবিলা করা যায় না—এটি একটি আশ্চর্য বিষয়।
টঙ্গীর মধ্য আউচপাড়া এলাকার ক্বরীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি অপরাধ করেন, সেই অপরাধের জন্য তিনি শাস্তি ভোগ করবেন। আর যদি তিনি অন্যায়ের শিকার হন, তাহলে তিনি নিরপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। কারোরই নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া উচিত নয়।
শিক্ষকদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অক্ষুণ্ন রাখার আহ্বান জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, শিশু-কিশোরেরা যেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছে নিজেদের অনিরাপদ মনে না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকেরা পিতা-মাতার বিকল্প অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক বা দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্য পুরো শিক্ষক সমাজকে লক্ষ্যবস্তু করা উচিত নয়।
সন্তানের কোনো ক্ষতি হলে মা-বাবার আবেগ স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে তার মতে, পুরো বিষয়টি আইনি কাঠামোর মধ্যেই সমাধান করা সম্ভব।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তিনি জানতে পেরেছেন, গাজীপুরের ওই ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তা তদন্তাধীন। আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় সেখানেই ঘটনার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে বলে তিনি আশা করেন।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৯ অক্টোবর টঙ্গীর মধ্য আউচপাড়া এলাকার মাদ্রাসাটির নিচতলার সিঁড়িতে প্রথম শ্রেণির ওই ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন করা হয়। ঘটনার পর শিশুটি মাদ্রাসায় যেতে চাইছিল না। পরিবারের সদস্যরা কারণ জানতে চাইলে প্রথমে সে কিছু বলেনি; পরে মা-বাবার জিজ্ঞাসাবাদে সে ঘটনার কথা জানায়।
এরপর গত ২১ অক্টোবর দুপুরে শিশুটির স্বজনেরা মাদ্রাসায় গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। শিক্ষককে মারধরের কয়েকটি ভিডিও বৃহস্পতিবার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
২৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাদ্রাসার ভেতরে কয়েকজন ওই শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। ভিডিওতে শিক্ষককে বলতে শোনা যায়, ছাত্রদের সঙ্গে তার অন্য রকম সম্পর্ক—সবার সঙ্গে, বিশেষ করে ক্লাস ওয়ানের। একপর্যায়ে তিনি ‘চুমু’ শব্দটি বললে ‘কিসের চুমু রে’ বলে তাকে থাপ্পড় ও মারধর শুরু করেন শিশুটির স্বজনেরা।
একপর্যায়ে ঘটনা জানাজানি হলে স্থানীয় লোকজনও সেখানে জড়ো হন এবং শিক্ষককে মারধর করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
এ ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তারের পর থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক কারাগারে রয়েছেন।
ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা মহলে আলোচনা চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার বক্তব্য দুটি দিক একসঙ্গে সামনে এনেছে—অভিযোগের বিচার আইনি প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত করা এবং উত্তেজিত হয়ে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া থেকে বিরত থাকা।
অ্যাটর্নি জেনারেল একই সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা ও শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা—দুটি বিষয়ই অক্ষুণ্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুরা যেন নিজেদের নিরাপদ মনে করে এবং শিক্ষকদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা যেন কোনো আচরণের কারণে নষ্ট না হয়—দুটোই নিশ্চিত করা জরুরি।
মামলাটি এখন তদন্তাধীন। তদন্ত শেষে আইনি প্রক্রিয়ায়ই ঘটনার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।






