দ্বিতীয় দফার বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, আটক প্রায় এক হাজার; ইতালির মিলানে সেনা মোতায়েন, ইউরোপজুড়ে রাজপথে তরুণরা
ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার অবনতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের প্রতিবাদে দ্বিতীয় দফায় রাজপথে নেমেছেন লাখো মানুষ। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেশজুড়ে এই গণবিক্ষোভের বেশিরভাগই শান্তিপূর্ণ থাকলেও রাতে প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে, আর দিনভর দেশজুড়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় এক হাজার মানুষকে। একই দিনে ইতালিসহ ইউরোপের আরও অনেক শহরেও বড় বিক্ষোভ হয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার ৭০ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করেছিল। গত সপ্তাহের তুলনায় এবার সার্বিক সহিংসতার মাত্রা কম ছিল বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, আগের সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার ৭০০ জনকে আটক করা হয়েছিল এবং বহু দোকানপাটে লুটপাট চালানো হয়েছিল।
এবার শপিং সেন্টার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম হয়েছে। রাজধানী প্যারিসে মূল পদযাত্রাটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও শেষ দিকে প্রায় ৫০০ চিহ্নিত দাঙ্গাবাজসহ কয়েক হাজার উগ্র কর্মী একত্র হয়ে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
কান ও মন্তপেলিয়ে শহরে প্রথমবারের মতো অতি-ডানপন্থি কর্মীদেরও রাস্তায় নামতে দেখা গেছে — যারা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রক্ষার অজুহাতে কিংবা অতি-বামপন্থিদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর চেষ্টা চালিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রোববার পর্যন্ত পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের দাবি থেকে — তারা স্কুলের পরিবেশ উন্নত করা এবং কর্মী সংকট দূর করার দাবি জানিয়েছিল। পরে কিছু জায়গায় আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়, আর জীবনযাত্রার ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে শনিবারের বিক্ষোভে যোগ দেয় ট্রেড ইউনিয়ন ও বিরোধী দলগুলো।
একই দিনে ইতালির মিলান, রোম ও তুরিনসহ একাধিক শহরে হাজার হাজার তরুণ মিছিল করেছে। গত সপ্তাহের সহিংস সংঘর্ষ ও লুটপাটের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও সেনা মোতায়েন করে — যা অনেকাংশে সফল হয়েছে। মিলানের বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও রোম ও তুরিনে পুলিশের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়েছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি একগুচ্ছ পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন — এর মধ্যে রয়েছে মিলানে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা পাঠানো এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান; পুলিশ বলছে, গত সপ্তাহের সহিংস বিক্ষোভকারীদের বড় অংশই ছিল নাবালক। মিলানে সেনারা আগে থেকে অবস্থানরত শত শত সেনার সঙ্গে যোগ দিয়েছেন, আর প্রায় পাঁচ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীকে সহায়তা করছেন। মিলানে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কয়েকজন নাবালককে আটকও করেছে পুলিশ।
মিলানের ফ্যাশন এলাকার বিলাসবহুল বুটিকগুলো — ওমেগা, টিফানি ও গুচিসহ — জানালা বোর্ড দিয়ে ঢেকে ফেলেছিল, অ্যাপল স্টোরও বন্ধ ছিল; যদিও বিকেলের দিকে বেশিরভাগ দোকান খুলে যায়। কর্তৃপক্ষ ড্রোন নজরদারি, রেলস্টেশনে তল্লাশি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট এবং সহিংসতার সম্ভাব্য আহ্বান নজরদারিতে অনলাইন পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করেছে। একদল বিক্ষোভকারী ইতালির জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাইরে গোবর ফেলে এবং একটি প্রতীকী বড় আকারের বিদ্যুৎ বিল পুড়িয়ে দেয়।
মিলানের মেয়র পদের প্রত্যাশী পিয়েরফ্রান্সেসকো মাজোরিনো মিছিলে যোগ দিয়ে দিনটি কতটা শান্তিপূর্ণ ছিল তা উল্লেখ করেন; তিনি ২০২৭ সালের শুরুর দিকে মধ্য-বাম প্রাথমিক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। বর্তমান মধ্য-বাম মেয়র জুসেপ্পে সালা, যিনি ২০১৬ সাল থেকে দায়িত্বে আছেন, আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না। বিক্ষোভকারীরা সন্ধ্যায় শহরের কেন্দ্র থেকে তিন কিলোমিটারের বেশি দূরে মিলান পলিটেকনিকের বাইরে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল শেষ করেন।
গত সপ্তাহান্তে দাঙ্গাকারীরা শহরের কেন্দ্রীয় দুয়োমো চত্বরের আশপাশের রাস্তায় দোকানে ঢুকে স্নিকার, খেলার পোশাক ও ক্রীড়াসামগ্রী লুট করেছিল — সেই স্মৃতিই এবারের কড়া নিরাপত্তার পেছনে বড় কারণ। নিরাপত্তাব্যবস্থা শহরের কেন্দ্র ছাড়িয়ে অন্য এলাকাতেও বিস্তৃত ছিল, যাতে বিক্ষোভকারীরা অন্য পাড়ায় সরে যেতে না পারে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা একজন ৩০ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্স সাংবাদিককে তদন্ত করছে, যাকে নতুন গঠিত ১৭ অক্টোবর আন্দোলনের কথিত মূল পরিকল্পনাকারী বলা হচ্ছে — এই আন্দোলনই ইতালির সাম্প্রতিক বিক্ষোভের প্রধান চালিকাশক্তি। অন্যদিকে রোমে ডানপন্থি ছাত্রগোষ্ঠীগুলো বামপন্থি ছাত্র বিক্ষোভের বিরোধিতায় মিছিল করেছে; নানা রাজনৈতিক ধারার গোষ্ঠী একই দিনে রাজপথে ছিল।
ফ্রান্সের বিক্ষোভই আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে থাকলেও শনিবার মাদ্রিদ, লিসবন ও তিরানাসহ ইউরোপের বহু শহরেই বড় বিক্ষোভ হয়েছে। শিক্ষা ও দুর্নীতি থেকে যুদ্ধবিরোধিতা, পেনশন ও আবাসন — নানা ইস্যু ঘিরে এই বিক্ষোভগুলো চলছে, আর ইউরোপের সরকারগুলোর জন্য তা ক্রমেই বড় চাপ হয়ে উঠছে।






