ব্রিটেনে কোকেন-সংশ্লিষ্ট অপরাধ বাড়ছে: এক বছরে সেবন ১ লাখ ২৩ হাজার কেজি, বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার কোটি পাউন্ড
ব্রিটেনে কোকেনের সেবন দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধও — হামলা, পারিবারিক নির্যাতন ও বিপজ্জনক গাড়ি চালানোসহ নানা ঘটনায় এই মাদকের সংশ্লিষ্টতা পাচ্ছে পুলিশ। বর্জ্য পানির নমুনা বিশ্লেষণ ও অপরাধের পরিসংখ্যান মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত ব্যবহারকারীরাই আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে ও ঘন ঘন কোকেন সেবন করছেন।
এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের পর থেকে ব্রিটেনের পুলিশ বাহিনীগুলোর নথিতে কোকেন-সংশ্লিষ্ট অপরাধের হার বেড়েছে ১০ শতাংশ। একই সময়ে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, ২০২১ সালের পর থেকে ইংল্যান্ডে কোকেনের ব্যবহার বেড়েছে ২৬ শতাংশ।
কোকেন একটি শক্তিশালী ও আসক্তিকর উত্তেজক মাদক, যা উচ্ছ্বাস, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, অস্থিরতা ও সন্দেহপ্রবণতা তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এর ব্যবহার আগে থেকে উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে সহিংস ঘটনায় রূপ দিতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেবন বাড়ার একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে কম দাম, আর একই সঙ্গে উচ্চ বিশুদ্ধতা বজায় থাকা। বর্জ্য পানির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে ইংল্যান্ডে মানুষ সেবন করেছে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার কেজি কোকেন — যা প্রায় ২৫০ কোটি লাইন কোকেনের সমান, এবং এর আনুমানিক খুচরা মূল্য প্রায় ১ হাজার কোটি পাউন্ড।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অন্তত ২৯ হাজার ৯২২টি অপরাধের রেকর্ডে কোকেন শব্দটির উল্লেখ ছিল — যা প্রতি এক লাখ মানুষে ৬৩.৪টি করে। ২০১৯ সালে এই হার ছিল প্রতি লাখে ৫৭.৭টি। চলতি বছরের মে পর্যন্ত পাওয়া হিসাব বলছে, ২০২৬ সালে তা প্রতি লাখে প্রায় ৬৪টিতে পৌঁছাতে পারে — সাত বছরে ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।
স্কটল্যান্ডে ২৮ বছর পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সংগঠিত অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও লেখক মার্টিন গ্যালাঘার বলেন, কোকেনের ব্যবহার এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এটি সামাজিক অভিজাতদের মাদক থেকে স্থানীয় পাবের টয়লেটে সেবন করা জিনিসে পরিণত হয়েছে।
গত বছর কোকেন-সংশ্লিষ্ট অপরাধের বেশিরভাগই ছিল মাদক অপরাধ, তবে ১৮ শতাংশ ছিল সহিংস অপরাধ — যার মধ্যে রয়েছে অনুসরণ-হয়রানি এবং একটি হত্যার ঘটনা। এ ছাড়া এ ধরনের অপরাধ প্রতিবেদনের ৪ শতাংশের সামান্য কম ছিল যৌন অপরাধ, যার মধ্যে ৩৪৪টি ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে।
পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনায় কোকেনের ভূমিকা আলাদা পরিসংখ্যানেও উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত পারিবারিক নির্যাতনের সন্দেহে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ওপর চালানো পুলিশের মাদক পরীক্ষায় প্রায় প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জনের শরীরেই কোকেনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে এই তথ্য প্রতিনিধিত্বমূলক নয় বলে সতর্ক করা হয়েছে, কারণ অনেক ক্ষেত্রে মাদক ব্যবহারের সন্দেহের পরই পরীক্ষা করা হয়েছিল।
লিভারপুল জন মুরস বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদক ব্যবহার বিষয়ক অধ্যাপক হ্যারি সামনাল বলেন, বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় কোকেন সরাসরি সহিংস আচরণ ঘটায় — এমন শক্ত প্রমাণ মেলেনি। তবে পারিবারিক সহিংসতা প্রায়ই ক্ষমতার প্রশ্নে গড়ে ওঠে, এবং অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগী উভয় পক্ষই বর্ণনা করেছে, কীভাবে কোকেনের নেশা নিয়ন্ত্রণ হারানো ও ঈর্ষা বাড়িয়ে সহিংস ঘটনা ঘটায় এবং বিদ্যমান নির্যাতনকে আরও ঘন ঘন ও তীব্র করে তোলে। অপরাধের রেকর্ডে কোকেনের উল্লেখ থাকা মানেই মাদকটিই অপরাধের কারণ — এমনটাও প্রমাণ হয় না বলে তিনি সতর্ক করেন।
সড়ক নিরাপত্তা সংস্থা আইএএম রোডস্মার্টের পাওয়া চালক ও যানবাহন লাইসেন্সিং সংস্থার তথ্য বলছে, গত বছর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মাদক সেবন করে গাড়ি চালানোর অপরাধ মদ্যপান করে গাড়ি চালানোর অপরাধকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৫ সালে লাইসেন্সে যোগ হয়েছে ৩০ হাজার ৭০৭টি মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ (২০২২ সালের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি), আর মদ্যপান-সংক্রান্ত অপরাধ ছিল ২৯ হাজার ৭৬৯টি (১৭ শতাংশ কম)।
দামের চিত্রটাও বলছে সরবরাহের গল্প। জাতীয় অপরাধ সংস্থা জানিয়েছে, পাইকারি দাম ২০২২ সালে মহামারির আগের স্তরের নিচে নেমে যায় এবং ২০২৫ সালে পৌঁছায় ঐতিহাসিক সর্বনিম্নে; তবে ২০২৬ সালে দাম আবার বাড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মাদক বাজার বিশেষজ্ঞ ড. জশ টরান্সের হিসাব অনুযায়ী, এক আউন্স কোকেনের দাম ২০২২ সালের মার্চে প্রায় ১ হাজার ৩০০ পাউন্ড থেকে নেমে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রায় ৭০০ পাউন্ডে পৌঁছেছিল, পরে তা আবার বেড়ে প্রায় ৯৫০ পাউন্ডে দাঁড়িয়েছে।
বিশুদ্ধতার দিক থেকেও ঝুঁকি কম নয়। টরান্সের মতে, খাঁটি বলে বিক্রি হওয়া কোকেন প্রায়ই ৭০-৮০ শতাংশ বিশুদ্ধ হয়, আর ভেজালমিশ্রিত স্তরটির বিশুদ্ধতা থাকে প্রায় ৬০ শতাংশ। জাতীয় অপরাধ সংস্থা বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাইকারি বিশুদ্ধতা উচ্চই রয়েছে। টরান্সের পর্যবেক্ষণ — দাম কমলে ব্যবহার বাড়ে, আর ব্যবহার ও বিশুদ্ধতা দুটোই বাড়লে মৃত্যুও বাড়ে। কোকেন-সংশ্লিষ্ট মৃত্যু এরই মধ্যে রেকর্ড স্তরে পৌঁছেছে, আর বয়স্ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে ক্ষতির মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে বলে তথ্য বলছে।






