…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › জাতীয় › খবর
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — আবদুল কুদ্দুস, চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ
জাতীয়

জালে মাছ কম, তবু কমতি নেই আনন্দে: ঠাকুরগাঁওয়ের বুড়ির বাঁধে মাছ ধরার উৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক

একবার, দুবার, তিনবার — এভাবে পরপর চারবার জাল ফেলেও মাছের দেখা পেলেন না পরিমল রায়। প্রতিবারই খালি জাল তুলে হতাশ হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লী উপজেলার কার্তিকতলা গ্রামের এই বাসিন্দা। পাশে থলে হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সুজন রায় তখন সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘জাল ফেলেক, এইবার বড় একখান মাছ উঠিবে।’

বন্ধুর কথায় শেষবারের মতো জাল ফেললেন পরিমল। ঝপাৎ করে পানিতে ডুবে যাওয়া জালটি টেনে তুলতেই দেখা গেল, সেখানে আটকে আছে দুটি পুঁটি মাছ। ছোট্ট এই প্রাপ্তিতেই মুখে হাসি ফুটল তার। এই ছোট্ট দৃশ্যটাই বলে দেয়, বুড়ির বাঁধের উৎসবে মাছ পাওয়াটাই একমাত্র কথা নয়।

মাছ মিলুক বা না মিলুক, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সুক নদের ওপরের বুড়ির বাঁধে (জলকপাট) পরিমলের মতো অনেক মানুষের কাছে মাছ ধরার আনন্দটা শুধু মাছ পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বন্ধু-স্বজন নিয়ে দলবেঁধে মাছ ধরা, খুনসুটি, জাল ফেলা আর তাতে মাছ উঠে আসা — সব মিলিয়েই এটা তাদের জন্য একটা উৎসব।

গত শুক্রবার রাতের আঁধার তখনো কাটেনি। আবছায়ায় চারপাশ থেকে ভেসে আসছিল ঝপাৎ ঝপাৎ শব্দ। একটু একটু করে পুব আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে পড়তেই দৃশ্যমান হয়ে উঠল সেই শব্দের উৎস। বাঁধ এলাকায় নানা বয়সী মানুষ — কেউ বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে, কেউ কোমরসমান পানিতে নেমে জাল ফেলছেন। তবে তাদের অধিকাংশের জালই ফাঁকা; কিন্তু তাতে কারও উৎসাহে ভাটা পড়ছে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ঠাকুরগাঁও কার্যালয় ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সম্পূরক সেচের সুবিধা দিতে সদর উপজেলার আকচা ও চিলারং ইউনিয়নের সীমানায় ১৯৫১-৫২ অর্থবছরে বুড়ির বাঁধ সেচ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। বাঁধের পানি ধরে রেখে সেচের সুবিধা দেওয়াই প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। পরে ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে নির্মাণ করা হয় ১১ দশমিক ৩০ কিলোমিটার সেচখাল, যার মাধ্যমে ১ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করা হচ্ছে।

স্থানীয় লোকজন বলেন, বাঁধে আটকে থাকা পানিতে প্রতিবছর বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের পোনা অবমুক্ত করে মৎস্য বিভাগ। আর বুড়ির বাঁধ পানি ব্যবস্থাপনা অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে এসব মাছের দেখভাল করা হয়। প্রতিবছর অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে বাঁধের পানি ছেড়ে দিয়ে মাছ ধরার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তারপরই আশপাশের মানুষের মধ্যে শুরু হয় মাছ ধরার উৎসব। জলকপাট নির্মাণের পর থেকেই উৎসবের এ রেওয়াজ চলে আসছে। মাছ ধরার এই উৎসব চলে দুই থেকে তিন দিন। সাধারণত ঘোষণা দিয়ে বিকেলের দিকে পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। ভোরে পানি কমে এলে আশপাশের গ্রামের মানুষজন হাতে ফিকা জাল, খইয়া জাল নিয়ে এখানে মাছ ধরতে আসেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন এলাকার মানুষজন, বাদ যান না আশপাশের জেলার মানুষও।

গতকাল শনিবার ভোরে সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর জল থেকে জাল টেনে তোলার পর দু-একটি ছোট মাছ হাতে নিয়ে ফিরছেন কেউ কেউ, কেউ আবার নতুন করে জাল সাজাচ্ছেন। সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে মানুষের ভিড়ও। কেউ কয়েকটি পুঁটি মাছ পেয়ে খুশি, কেউ আবার বড় মাছের আশায় বারবার জাল ফেলে চলছেন। মাছের প্রাপ্তি কম হলেও মানুষের আনন্দে ঘাটতি নেই।

চার বন্ধু মিলে গত শুক্রবার রাতে বাঁধে মাছ ধরতে আসেন সদর উপজেলার পূর্ব বেগুনবাড়ি গ্রামের আনোয়ার হোসেন (৩৫)। পালা করে জাল ফেলতে ফেলতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়েন তারা। বিশ্রামের ফাঁকে আনোয়ার বললেন, ‘চার-পাঁচ বছর ধরে এই বাঁধে মাছ ধরতে আসি। হইহুল্লোড় করে দিন কেটে যায়। কোনো বছরই আশানুরূপ মাছ পাই না। তবু আসি। এখানে এলে সবার সঙ্গে দেখা হয়, আনন্দ করা যায়।’

বাঁধের হাঁটুসমান পানিতে দাঁড়িয়ে একের পর এক জাল ফেলছিলেন পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার রানীগঞ্জ এলাকার তপন রায় (২৯)। জাল ফেলতে ফেলতে তিন ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি। এ সময় তার ভাগ্যে জুটেছে আধা কেজির মতো ছোট মাছ। তাতেই খুশি তিনি। মাছ ধরতে আসার কারণ জানতে চাইলে তপন বলেন, ‘এইঠে খালি কী মাছ মারিবা আইচ্ছু? আনন্দও-তো হচে।’

জাল ফেলতে ফেলতে হাঁপিয়ে উঠেছেন বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ধনতলা গ্রামের জয়ন্ত বর্মন (৪৭)। হঠাৎ হাতের জালটি রেখে ‘সারা দিন ধাপ ঠেলিয়ে / হলাম কেবল বলসারা / কই হল মোর মাছ ধরা’ গানটি ধরলেন। তার সঙ্গে সুর মেলালেন কেউ কেউ। একপর্যায়ে গান থামিয়ে জয়ন্ত বললেন, ‘মোর আর মাছ ধরা হবেনি। বাড়ি ফিরে যাবা হবে। ফেরার আগতে কিছু মাছ কিনে নিবা হবে।’ কারণ জানতে চাইলে তিনি প্যারোডির সুরে বললেন, ‘বউ আমার ভাত খাবার চাইছে পুঁটি দিয়া / কই হল মোর মাছ ধরা / ফাটি যায় হিয়া’। এরপর তিনি বললেন, ‘আমার বউ পুঁটি মাছের ঝোল রান্নার জন্য অপেক্ষা করে আছে। আর এদিকে আমি তো মাছই পেলাম না। তাই কিছু মাছ কিনে নিয়ে বউয়ের সাধ মেটাতে হবে।’

অনেকের মনে যখন হতাশা, তখন রুহিয়া উপজেলার রামনাথ এলাকার বাসিন্দা ইয়াসিন আলীর জালে উঠে আসে একটা ‘জাপানি রুই’। মাছটির ওজন হবে এক কেজির ওপরে। ইয়াসিন বললেন, ‘অনেকেই তেমন মাছ পায়নি। এত বড় মাছ পেয়ে আমি খুবই খুশি।’ অন্যদিকে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রমজান আলী (৫৬) বলেন, ‘এই বুড়ির বাঁধে একসময় রুই, কাতলা, বোয়াল, পুঁটি, শোল, ট্যাংরা, খলসেসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। বছর-বছর মাছ ধরতে আসা মানুষজনের সংখ্যা বাড়ছে, তবে জালে খুব একটা মাছ উঠছে না।’ তার কথার সঙ্গে সুর মেলালেন আখানগর এলাকার রমণী কান্ত রায় (৬৩)। তিনি বলেন, ‘আগতে জাল ফেললেই কত মাছ জালত উঠিলহে। কিন্তু অ্যালা মাছই নাই।’ তার অভিযোগ, এলাকার মানুষ চারদিকে কারেন্ট জাল বিছিয়ে মাছগুলোকে আটকে রেখেছে, ফলে সেখান থেকে মাছ বের হতে পারছে না।

মাছ ধরার এ উৎসবকে কেন্দ্র করে বাঁধের ওপর বসেছে খাবারের হোটেল, ফল, খেলনা ও প্রসাধনীর দোকান। বাইরের এলাকা থেকে আসা মানুষের মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল রাখার জন্য তৈরি হয়েছে অস্থায়ী গ্যারেজ। বাঁধের ওপর পসরা সাজিয়ে বসেছেন মাছ ব্যবসায়ীরা, কেউ কেউ সেই মাছ কিনে বাড়ি ফিরছেন। ঠাকুরগাঁও জেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার সরকার বলেন, প্রতিবছর বুড়ির বাঁধের পানিতে কমবেশি মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়, পরে মাছ ধরার জন্য তা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, সেই সময় মাছ ধরাকে ঘিরে উৎসব জমে ওঠে; এবারও মাছ ধরতে কয়েক শ মানুষ সেখানে জড়ো হন। কারেন্ট জাল বিছানো সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কারেন্ট জালের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে আসছি।’ পাউবোর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুর রহমান বলেন, প্রতিবছর বাঁধের কপাট খুলে দেওয়া হয়, সে সময় এলাকাটি মিলনমেলায় পরিণত হয়। প্রবীণ শিক্ষক ও লেখক অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে বলেন, ‘যারা সেখানে মাছ ধরতে যান, তাদের কাছে এই উৎসব শুধু মাছ ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া, নতুন মানুষের সঙ্গে সখ্য গড়া আর গ্রামীণ জীবনের এক টুকরা আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার উপলক্ষও।’

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — জাকির হোসেন, সম্ভাব্য ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী, ৭ নং ওয়ার্ড, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন

জাতীয় বিভাগের আরও খবর

জাতীয়

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের কারণে একনেক বৈঠক স্থগিত, পিছিয়ে গেল প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার ১৫ প্রকল্পের অনুমোদন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের কারণে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) নির্ধারিত বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। এর ফলে প্রায় ৯ হাজ…

জাতীয়

টানা চতুর্থ দফায় কমল সোনার দাম: ভরিতে সাড়ে তিন হাজার টাকার বেশি ছাড়, আজ থেকে কার্যকর

টানা চতুর্থ দফায় দেশের বাজারে সোনার দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের …

জাতীয়

চার দিনের সফরে রাতে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে নতুন গতির আশা

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রবিবার দিবাগত রাত ১২টা ১০ মিনিটে বিমান…

জাতীয়

বিসর্জনের প্রস্তুতির মুহূর্তে বদলে গেল সিদ্ধান্ত: যশোরের কৈখালীতে দ্বিতীয় দফায় হলো দুর্গাপূজা

সারা দেশে শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে ২১ অক্টোবর। কিন্তু যশোর সদর উপজেলার কৈখালী সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে ঘটেছে এক ব্যতিক্রমী আয়োজন। প…