…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › আইন ও অপরাধ › খবর
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — আবদুল কুদ্দুস, চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ
আইন ও অপরাধ

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রেলই সহজ লক্ষ্য, অথচ পাহারায় মাত্র আড়াই হাজার পুলিশ: রেলওয়ে পুলিশ প্রধানের খোলামেলা হিসাব

নিজস্ব প্রতিবেদক

যেকোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় রেলওয়েকে খুব সহজ লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয় — এখানে আগুন দেওয়া ও ককটেল নিক্ষেপের মতো ঘটনা ঘটানো হয়। কথাগুলো বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি (চার্জ) ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমানের। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, মাত্র আড়াই হাজার রেলওয়ে পুলিশ আর রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) মিলিয়ে চার হাজারেরও কম জনবল দিয়ে পুরো রেল এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই হামলা ও নাশকতা চালানো সহজ হয়।

রেলপথে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মাদক চোরাচালান ও ছিনতাই প্রতিরোধ, টিকিটের কালোবাজারি বন্ধ এবং ট্রেনে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা মোকাবিলাসহ বহুমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে রেলওয়ে পুলিশের। এছাড়া ট্রেনের ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণও তাদের দেখতে হয়। জনবল খুবই কম থাকা সত্ত্বেও কীভাবে সবকিছু সমন্বয় করা হচ্ছে, তা নিয়েই তিনি খোলামেলা কথা বলেছেন।

তাঁর ভাষায়, রেলপথের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সক্ষমতার তুলনায় যাত্রী বেশি। বাংলাদেশ রেলওয়ে যে পরিমাণ কোচ সরবরাহ করে বা যাত্রী পরিবহন করতে পারে, তার মাধ্যমে মোট চাহিদার অর্ধেকও পূরণ করা সম্ভব হয় না। আবার যে পরিমাণ টিকিট সরবরাহ করা হয়, তার তুলনায় অনেক বেশি যাত্রী ট্রেনে উঠে পড়েন। ফলে স্টেশনে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ তৈরি হয় এবং তাদের কোনোভাবেই আটকে রাখা যায় না। দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অনেক যাত্রী ট্রেনের ছাদে উঠে পড়েন, যা সব যাত্রীর জন্যই নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে।

মাদক পরিবহনের ক্ষেত্রেও ট্রেনকে সহজ মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয় অপরাধীরা। জিল্লুর রহমান বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি কেবল রেলওয়ে পুলিশ দেখভাল করে না। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত, বিশেষ করে কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে আসা মাদক ঠেকাতে বিজিবি, এপিবিএন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং জেলা পুলিশ একসঙ্গে কাজ করে। বিজিবি প্রথম স্তরে কাজ করে, এর পরপরই দায়িত্ব পালন করে এপিবিএন, আর অধিদপ্তর সরাসরি কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে রেলপথের বিশাল পরিধি, পুলিশ সদস্যদের স্বল্পতা এবং তল্লাশির তুলনামূলক ঘাটতির কারণে অপরাধীরা ট্রেনকে মাদক চোরাচালানের সহজ মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়।

মাদক পরিবহনের হটস্পট রুটগুলোও চিহ্নিত করা হয়েছে। মূলত কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বেনাপোল ও দর্শনা রুট মাদক পরিবহনের জন্য বেশি ব্যবহৃত হয়। এসব হটস্পট সম্পর্কে পুলিশ অবগত রয়েছে এবং সেখানে সদস্য মোতায়েন রেখে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ মাদকসহ অপরাধীদের আটক করা হচ্ছে। তবে সমস্যার পরিধি অনেক বড় — একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে ৫০০ থেকে ৬০০ যাত্রী থাকেন, বগি থাকে প্রায় ৩০টি; বিপরীতে পুলিশ সদস্য থাকেন মাত্র তিন-চারজন, যাদের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতেই আধা ঘণ্টা সময় লেগে যায়।

এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বিমানের মতো ট্রেনেও ঘোষণা দেওয়া হয় — ট্রেনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘টিজি পার্টি’ (ট্রেন গার্ড) মাইকে নিজের পরিচয় ও মোবাইল নম্বর যাত্রীদের জানিয়ে দেন। ফলে যাত্রীরা ছিনতাই বা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হলে সরাসরি ফোনে যোগাযোগ করতে পারেন এবং পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে।

জনবলের সংকটের চিত্রটি সংখ্যায় আরও স্পষ্ট। বর্তমানে রেলওয়ে পুলিশের জনবল মাত্র ২ হাজার ৪৫০ জন। পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে মালবাহী ট্রেনে এবং অর্ধেকের বেশি যাত্রীবাহী ট্রেনে পুলিশ মোতায়েন করা সম্ভব হয় না। সব ট্রেন ও মালবাহী কনটেইনারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও অন্তত ৫ হাজার জনবলের জন্য আবেদন করা হয়েছে। ১৮৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের।

আরএনবির অবস্থাও একই রকম। ১৯৮০ সাল থেকে চালু হওয়া এই বাহিনীতে ৩ হাজার অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ১ হাজার ৩০০ জন কর্মরত আছেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রায় ১ হাজার ৭০০ পদ শূন্য রয়েছে।

দুই বাহিনীর দায়িত্বও আলাদা। রেলওয়ে পুলিশের মূল কাজ ট্রেন চলাচলের শুরু থেকে গন্তব্য পর্যন্ত যাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তা দেওয়া। ২৪টি থানা ও ৩২টি ফাঁড়ির মাধ্যমে অপরাধ দমন, মামলা গ্রহণ, তদন্ত, আসামি গ্রেপ্তার এবং আদালতে সোপর্দ করার কাজ করে তারা। ট্রেনে অস্ত্র ও অবৈধ মালামাল পরিবহন বন্ধ, টিকিটের কালোবাজারি রোধ এবং টিটিইদের সহায়তা করাও জিআরপির দায়িত্ব। অন্যদিকে আরএনবির মূল দায়িত্ব প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইনসহ রেলওয়ের যাবতীয় সম্পদ ও সম্পত্তি পাহারা দেওয়া — ট্রেন ধোয়া-মোছার সময় রাখা বগি, রাতে স্টেশনে থেমে থাকা ট্রেন এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব তাদের।

প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও কথা বলেছেন তিনি। রেলওয়ে পুলিশের নিজস্ব অর্থায়নে ইতোমধ্যে তিনটি ট্রেন এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সব জায়গায় মনিটরিং করা মূলত রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব; এ বিষয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। দেশের বড় বড় স্টেশনগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হলেও সব স্টেশনে এই ব্যবস্থা এখনও চালু করা সম্ভব হয়নি; রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

নাশকতা ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে রয়েছেন কি-ম্যান ও ওয়েম্যানরা। তাঁদের কাজ নির্দিষ্ট সময় পরপর রেললাইন পরীক্ষা করা। বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় যখন রেললাইনের স্ক্রু বা ফিশপ্লেট খুলে ফেলা হয়, তখন তাঁরা এসব পরীক্ষা করেন। তাঁরা কোনো অস্বাভাবিকতা দেখলে আরএনবি বা রেলওয়ে পুলিশকে জানান; প্রয়োজনে ট্রেনের গার্ড, চালক বা স্টেশন ম্যানেজারকে বিপৎসংকেত দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে বলেন। ট্রেনে আগুন বা নাশকতার ঘটনায় তদন্তে পুলিশের গাফিলতি পাওয়া গেলে যেমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়, আরএনবির অবহেলা থাকলেও তাদের বিরুদ্ধেও একইভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

ঈদ-পূজায় ট্রেনের ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারার কারণ হিসেবে তিনি আবারও চাহিদা-সরবরাহের হিসাব তুলে ধরেন। চাহিদা যদি ১০০ হয়, সরবরাহ হয় ৫০টি আসন; কিন্তু ১০০ জনই গন্তব্যে যেতে চান। ভাড়া তুলনামূলক কম, ভ্রমণ নিরাপদ এবং নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছানো যায় বলে বাকি ৫০ জনও মনে করেন, ছাদে হলেও তাঁরা পৌঁছাবেন। কমলাপুর বা বিমানবন্দরের মতো বিশাল স্টেশনে পুলিশ থাকেন দুই থেকে তিনজন, আরএনবির সদস্য থাকেন দুজন — মোট পাঁচজন দিয়ে এত বড় স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অনেক স্টেশনে ট্রেন মাত্র ৩০-৪০ সেকেন্ড বা এক মিনিট থামে, পুলিশ পৌঁছানোর আগেই অনেকে ছাদে উঠে পড়েন। স্টেশনগুলোর চারদিকে পর্যাপ্ত ঘেরাও বা নিরাপত্তা বেড়া না থাকাও একটি সমস্যা।

টিকিটের কালোবাজারি নিয়েও তাঁর পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট। অনলাইন টিকেটিং চালু হওয়ার পর আগের মতো ব্যাপকভাবে কালোবাজারি হয় না। তবে একটি আইডি দিয়ে চারটির বেশি টিকিট কাটা যায় না বলে অসাধু চক্র ১০ থেকে ১৫টি আইডি ব্যবহার করে ৬০টি টিকিট কেটে ফেলে, পরে সেগুলো বেশি দামে বিক্রি করে। আলাদা আইডি ব্যবহার করায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষে এসব শনাক্ত করা কঠিন হয়। তবে পুলিশ তাদের ধরছে, গ্রেপ্তার করছে এবং ঘটনাস্থলেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হচ্ছে। কীভাবে ব্যবস্থাটিকে আরও উন্নত করে কালোবাজারি পুরোপুরি বন্ধ করা যায়, সে বিষয়ে রেলওয়েকে জানিয়েছে রেলওয়ে পুলিশ।

সব মিলিয়ে রেলওয়ে পুলিশ প্রধানের বার্তা একটাই — বিশাল নেটওয়ার্ক, ক্রমবর্ধমান যাত্রীচাপ আর নাশকতার ঝুঁকির বিপরীতে জনবল ও প্রযুক্তি দুটোই প্রয়োজনের তুলনায় অনেক পেছনে। অন্তত ৫ হাজার অতিরিক্ত জনবলের আবেদন আর সব স্টেশনে সিসিটিভি চালুর প্রক্রিয়া কত দ্রুত বাস্তবায়ন হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে রেলযাত্রীদের নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — জাকির হোসেন, সম্ভাব্য ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী, ৭ নং ওয়ার্ড, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন

আইন ও অপরাধ বিভাগের আরও খবর

আইন ও অপরাধ

ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনি দায়িত্বে থাকা পুলিশের ওপর পিকআপ তুলে হত্যাচেষ্টা, চালকসহ আটক দুজন কারাগারে

ঠাকুরগাঁওয়ে উপনির্বাচনের দায়িত্ব পালনের সময় ট্রাফিক পুলিশের সংকেত অমান্য করে এক পুলিশ সদস্যের ওপর পিকআপ ভ্যান তুলে দিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।…

আইন ও অপরাধ

নিখোঁজের ১৩ বছরেও ফেরেননি হনুফা, মেয়ের অপেক্ষায় বৃদ্ধ মা-বাবা

প্রায় ১৩ বছর ধরে মেয়ের কোনো খোঁজ নেই। কত জায়গায়, কত মানুষের কাছে, কত আত্মীয়স্বজনের কাছে গিয়েছেন বৃদ্ধ মা-বাবা, কেউই কিছু বলতে পারেন না। হাঁটতে য…

আইন ও অপরাধ

চট্টগ্রামে অস্ত্রের মুখে সাংবাদিককে জিম্মি করে টাকা আদায়, প্রধান আসামি ‘ভেড়া সাইফুল’ গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামের হালিশহরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অস্ত্রের মুখে সাংবাদিককে জিম্মি, মুক্তিপণ দাবি এবং বিকাশের মাধ্যমে টাকা আদায়ের ঘটনায় দায়ের করা মামলায়…

আইন ও অপরাধ

ঝিনাইদহে পরকীয়ার অভিযোগে নারীকে মারধর ও চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ, আইনে শাস্তির বিধান কার জন্য

ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় পরকীয়ার অভিযোগ তুলে এক নারীকে মারধর করা, তাঁর চুল কেটে দেওয়া এবং শরীরে মরিচের গুঁড়া মাখিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সত্…